শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

রাজধানীর বাসা-বাড়িতে গ্যাসের তীব্র সংকট; বাজারে মিলছে না এলপিজি

একে সালমান
প্রকাশিত: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

রেস্তোরাঁয় গ্যাসের চুলা বিস্ফোরণে দুজন আহত 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা-বাড়িতে গ্যাসের লাইনে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পরিবারের সদস্যসহ শিশুদের খাবার রান্নায় ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু বছরের শুরুতে হঠাৎ করে বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে এলপিজি। মাঝে মধ্যে নিম্নমানের বোতলজাত এলপিজি গ্যাস মিললেও কয়েকগুণ দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। এতে প্রতি ১২ কেজি এলপিজি বোতল গ্যাসের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। 
 
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

রাজধানীর হাজারীবাগের টালি অফিস এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী নাহিদা আক্তার ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রতিদিন রান্না করার জন্য রাতে না ঘুমিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সারাদিন গ্যাস থাকে না। রাত ১২টা থেকে ১টার মধ্যে গ্যাস আসে। তবে গ্যাস আগের তুলনায় অনেক কম। মোটামুটি রান্নাবান্না করা যায়। এরপর ২-৩ ঘণ্টার মতো গ্যাস থাকে। কিন্তু ততক্ষণে সারাদিনের জন্য রান্নাবান্না কোনো রকম করে রাখতে পারি।


বিজ্ঞাপন


নাহিদা আক্তার আরও বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে সবচেয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় বাচ্চার খাবার তৈরি করতে গিয়ে। শীতের সময় স্কুলে যাওয়ার আগে নাস্তা করিয়ে স্কুলে পাঠাতে গিয়ে দেখি রাতে যা রান্না করেছি সব ঠান্ডা হয়ে গেছে। অনেক সময় রাতে গ্যাস এলে সবার আগে শিশুর খাবার তৈরি করে রাখি। গ্যাস সংকট হওয়ার কারণে শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা যায় না। দেখা যায়, আগের দিন রাতে রান্না করা বাসি খাবার খাওয়াতে হয়। এতে শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। 

কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী ইসরাত জাহান ঢাকা মেইলকে বলেন, এ এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র। রাতের বেলা ১টার পর কিছুক্ষণের জন্য গ্যাস আসে। ১-২ ঘণ্টার মধ্যে রান্না না করলে পরে আর গ্যাস পাওয়া যায় না। সকালে শিশু সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর আগে খাবার ইলেকট্রিক চুলায় গরম করে খাইয়ে স্কুলে পাঠাই। কোনো পুষ্টিকর খাবার তাৎক্ষণিক তৈরি করে শিশুকে খাওয়ানোর মতো অবস্থা থাকে না। প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে অনেক সময় ঠান্ডা খাবার খাইয়ে শিশুকে স্কুলে পাঠাতে হয়। 


বিজ্ঞাপন


এলপি গ্যাস নিয়ে ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ চলছেই

ইসরাত জাহান বলেন, ‘গ্যাস থাকে না, তাই বাজার থেকে বোতলজাত গ্যাস কেনার জন্য আমার স্বামীকে বলেছি। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখে, বোতলজাত গ্যাস নেই। মাঝে লোহার বোতলের গ্যাস পেয়েছিল। কিন্তু ১২ কেজি একটা বোতলের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা চাওয়ায় আর কেনা হয়নি। তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে বৈদ্যুতিক চুলা জ্বালিয়ে রান্না করা যায় না। বিদ্যুতের বিল কয়েকগুণ আসে। এর পাশাপাশি আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব করতে গেলে বেঁচে থাকা মুশকিল হয়ে যায়। কারণ, তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে একটা গ্যাসের চুলা কিনতে গেলে সর্বনিম্ন ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ হয়। আবার গ্যাসের বোতল আনতে গেলে বর্তমান বাজারে ২ হাজার টাকা থেকে ২৫০০ টাকা গুনতে হয়। এখানেই প্রায় ৪-৫ হাজার টাকা নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে গেলে ৫-৬ হাজার টাকা ছাড়া পাওয়া যায় না। আবার বিদ্যুৎ বিল কয়েকগুণ চলে আসে। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে অনাহারে দিন কাটানো ছাড়া উপায় নেই।”

একই অভিযোগ করেন মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা পারভীন বেগম। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার তিন সন্তান। সবাই স্কুলে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার আগে তাদের জন্য নাস্তা রেডি করতে হয়। নাস্তা করে স্কুলে যায়। কিন্তু এখন এমন পরিস্থিতি হয়েছে, তারা নাস্তা তো দূরের কথা, স্কুল থেকে ফেরার পর দুপুরে খাবার দিতে সমস্যা হয়। অনেক সময় দুপুরে বাইরে থেকে খাবার এনে খাওয়াতে হয়। গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাসের দেখা মেলে না। রাত ৩-৪টায় গ্যাস আসে। ততক্ষণ জেগে থেকে রান্না করতে করতে সকাল হয়ে যায়।

অনেক সময় রান্না করতে গিয়ে দেখা যায়, হঠাৎ গ্যাস চলে গেছে। কিন্তু রান্না শেষ হয় না। শীত মৌসুম এলেই গ্যাসের এমন সংকট দেখা যায়। অথচ এ বিষয়ে সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অন্তত ছোট ছোট শিশুদের কথা ভেবে গ্যাস সংকট দূর করা দরকার।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীতে স্বাভাবিকভাবেই পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ কমে যায় বলে সিলিন্ডারের গ্যাসের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সেই তুলনায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। চাহিদা ও জোগানের এই অসামঞ্জস্যের সুযোগ নিয়ে খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আমরা বাজারে বেশি দামে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।

মোহাম্মদপুর নবোদয় হাউজিং এলাকার এলপিজি ব্যবসায়ী ওয়াদুদ মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, গত ২-৩ দিন যাবৎ আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। এক গাড়ি এলেও কয়েকজন ব্যবসায়ীকে মিলে দেওয়া হচ্ছে। এতে গাড়ি আসার সঙ্গে সঙ্গেই সিলিন্ডার শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দোকানে কোনো অবশিষ্ট সিলিন্ডার গ্যাস থাকে না। আবার যেসব সিলিন্ডার বোতল আসছে, সেগুলোও আমাদের কাছে বাড়তি দামে দেওয়া হচ্ছে। সেজন্য আমরা ভোক্তাদের কাছে বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।

একই অভিযোগ করেন হাজারীবাগ এলাকার সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসায়ী কাইয়ুম মিয়া। তিনি বলেন, সারাদিন সিলিন্ডার গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করি। রাত ১২-১টার দিকে একটা গাড়ি এসে বোতল নামায়। ওই সময় খুচরা ব্যবসায়ীরা কাড়াকাড়ি করে যা পারে নিয়ে যায়। এই কাড়াকাড়ির মধ্যেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে দাম বেশি রাখে। বলে, বাজারে গ্যাস পাওয়া যায় না। বেশি দামে এনে তোমাদের খুচরা ব্যবসায়ীদের সাপ্লাই দিতে হচ্ছে। আমরা একরকম বাধ্য হয়েই কাড়াকাড়ি করে গ্যাসের বোতল আনতে হয়। এরপরও দোকানে গ্যাস থাকে না। দোকান পর্যন্ত আনার আগেই গ্যাস শেষ হয়ে যায়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেইন বলেন, পাইপলাইনের গ্যাস না থাকলে যেমন দেশজুড়ে হাহাকার তৈরি হয়, এলপিজির ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। এর প্রধান কারণ হলো, এই খাতের প্রায় পুরোটা এখন বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হাতে। কিন্তু শীতের সময় এলেই পাইপলাইনের গ্যাসের সংকট দেখা দেয়। এতে এলপিজি বোতলজাত গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে এলপিজি গ্যাস বর্তমানে একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ খাতের ভোক্তাদের ভোগান্তির বিষয়টি সেভাবে সামনে আসছে না, কারণ এই সমস্যাটি সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

ড. ইজাজ বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কোনোভাবেই যেন ভোক্তাদের চাহিদার ওপর কোম্পানিগুলো দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

একেএস/ক.ম 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর