তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে সরকার যে সংশোধন প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে, তা ঠেকাতে বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো।
বুধবার (৩ ডিসেম্বর) ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালীকরণ ঠেকাতে কোম্পানির প্রোপাগান্ডা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে জনস্বাস্থ্য ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞরা এসব অভিযোগ করেন। বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর ট্যোবাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) অনলাইন প্লাটফর্ম জুমে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
বিজ্ঞাপন
ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে অংশ নেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের ডিরেক্টর অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক বজলুর রহমান এবং একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি ও তামাক নিয়ন্ত্রণ গবেষক সুশান্ত সিনহা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনটিটিপি’র প্রজেক্ট ম্যানেজার হামিদুল ইসলাম হিল্লোল এবং সঞ্চালনা করেন সিনিয়র প্রজেক্ট অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল।
মূল বক্তব্যে হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, আইন সংশোধনের মাধ্যমে সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি বন্ধ, তামাক বিক্রিতে ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও শিশু পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ করা, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার মাধ্যমে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ, ৯০% স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা, শাস্তি বৃদ্ধি এবং সব পাবলিক প্লেস ও পরিবহনে ধূমপানের স্থান না রাখাসহ সময়োপযোগী বহু সংশোধনী আনতে চায় সরকার। কিন্তু এসব উদ্যোগ ব্যাহত করতে তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। তারা দাবি করছে, আইন শক্তিশালী হলে সরকারের রাজস্ব কমবে, অবৈধ সিগারেট বাড়বে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হবে—যা বাস্তবে ভিত্তিহীন।
তিনি তথ্য উপস্থাপন করে বলেন, গত ২১ বছরে তামাক থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় ১৬ গুণ। ২০০৫ এবং ২০১৩ সালে আইন সংশোধনের পরও রাজস্ব বৃদ্ধির ধারায় কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। এছাড়া এনবিআরের আটককৃত শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকায় কখনোই সিগারেটের নাম দেখা যায় না। আর্ক ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেশে অবৈধ সিগারেট বাজার মাত্র ৫.৪ শতাংশ বলে উঠে এসেছে। কর্মসংস্থান নিয়ে প্রচারণার প্রসঙ্গে তিনি জানান, সারা দেশের তামাক বিক্রেতাদের মাত্র ২.৪ শতাংশ (৬৩ হাজার) ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা কেবল তামাক বিক্রি করে। এছাড়া দেশের মোট বিক্রয়কেন্দ্রের মাত্র ১৮.৫ শতাংশ দোকানে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে তামাক বিক্রি হয়। তাই ১৫ লাখ মানুষের কর্মহানি—এ দাবি নিছক মিথ্যাচার।
সুশান্ত সিনহা বলেন, বাজেটের আগে আগে গণমাধ্যমে অবৈধ সিগারেট উদ্ধারের খবর ছড়ানো হয়, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম দামের সিগারেটের দেশগুলোর একটি। প্রতিবেশী দেশগুলোতে দাম অনেক বেশি; ফলে বেশি দামের দেশ থেকে কম দামের বাংলাদেশে চোরাচালানের যুক্তি টেকে না। বরং বড় তামাক কোম্পানিগুলো খুচরা বিক্রেতাদের ওপর নিয়মিত নজরদারি চালায়, ফলে নকল সিগারেটের প্রচারণা গ্রহণযোগ্য নয়।
বিজ্ঞাপন
বজলুর রহমান বলেন, শুধু সিগারেট বা জর্দা নয়, ই-সিগারেটের বাজার তৈরির জন্যও কোম্পানিগুলো মিথ্যাচার ও প্রচারণা চালাচ্ছে। সম্প্রতি নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমতি পাওয়া নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। দ্রুত নিকোটিন পাউচ বন্ধ না করলে এবং ই-সিগারেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তরুণ সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, তামাক কোম্পানি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মিথ প্রচার করে। সম্প্রতি অবৈধ সিগারেট নিয়ে প্রোপাগান্ডা বাড়ানো হয়েছে। তারা এনবিআরসহ বিভিন্ন সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। অথচ দেশের কোনো গবেষণায় এ দাবি সত্য পাওয়া যায়নি। তামাক কোম্পানির মিথ্যাচারে কান না দিয়ে সরকারের উচিত আইন দ্রুত সংশোধন করে শক্তিশালী করা।
ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই আইন সংশোধনের উদ্যোগ চলমান। কিন্তু তামাক কোম্পানির প্রভাব ও প্রোপাগান্ডা এ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারকে দ্রুত আইন সংশোধন করে এর দুর্বলতা দূর করা ও কোম্পানির মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ওয়েবিনারে তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অর্ধশতাধিক প্রতিনিধি সক্রিয়ভাবে আলোচনা করেন।
এএইচ/এআর

