ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এস এম সালেহ আহমেদ বলেছেন, ভূমি মানুষের জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ অনেক। জরিপ একটি বড় বিষয়। ভূমি সংক্রান্ত মামলার প্রায় ৮০ শতাংশই জরিপ কেন্দ্রিক।
আজ রোববার (২৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জনবান্ধব ভূমিসেবায় গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে অটোমেটেড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ALAMS)। সহযোগিতায় ছিল বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ)।
ভূমি সচিব বলেন, ভূমি অফিসে মানুষ হয়রানির শিকার হয় বেশি। ভূমি নিয়ে মানুষের অভিযোগও বেশি । তাই আমরা ভেবেছি, কীভাবে ঘরে বসে সেবা নিশ্চিত করা যায়। তাহলেই অফিসভিত্তিক হয়রানি কমবে। অনলাইনে ভূমির বিভিন্ন সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
সিনিয়র সচিব বলেন, মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই ভূমিকে ঘিরেই মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজের বিকাশ ঘটেছে। মানুষ ভূমির ওপর নির্ভর করেই খাদ্য উৎপাদন, বসবাস, শিল্পায়ন ও জীবিকার ব্যবস্থা করে থাকে। তাই বলা যায়, ভূমি শুধু একটি ভৌত সম্পদ নয়, এটি মানুষের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় ভূমি প্রশাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। একসময় ভূমি সেবা মানেই ছিল জটিলতা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও সময়ক্ষেপণ। কিন্তু এখন ‘স্মার্ট ভূমিসেবা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই চিত্র বদলেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত স্মার্ট ভূমিসেবা বিষয়ক কর্মশালা/সেমিনারে এই পরিবর্তনের ধারাকে আরও গতিশীল করেছে। ভূমি নিয়ে সমস্যার অন্যতম একটি কারণ ভূমি রেজিস্ট্রেশন, যদিও এটা ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয় তারপরও ভূমির ওপর দায়টা দেয় মানুষ।
এস এম সালেহ আহমেদ বলেন, গত বছরের ১ ডিসেম্বর থেকে অনলাইনে ৫টি ভূমি সেবা চালু করা হয়েছে। নাগরিকের চাওয়া-পাওয়ার অনেকটাই পূরণ হয়েছে। আমরা অনেক কাজ করেছি, তবে এখনও অনেক দূর যেতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নাগরিক সেবা কেন্দ্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে জনগণ সহজে ভূমি সেবা পেতে পারেন। বর্তমানে সারাদেশে ৮১৫টি ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ভূমি সেবা শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়, এটি নাগরিক সেবার এক বৈপ্লবিক রূপান্তর। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণের সময়, অর্থ ও পরিশ্রম বাঁচছে; একইসঙ্গে ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে। তাই বলা যায়, ডিজিটাল ভূমিসেবা বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সরকার ‘ভূমি সেবা এখন নাগরিকের দোরগোড়ায়’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ ব্যবস্থা; ই-নামজারি সেবা; ই-মিউটেশন ও ই-খতিয়ান যাচাই; ভূমি তথ্য ব্যাংক ও জিও-পোর্টাল, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড ব্যবস্থাপনা। এসব উদ্যোগের ফলে ভূমি ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে। আমরা অ্যাপ চালু করেছি, যার মাধ্যমে পর্চা সংগ্রহ, নকশা পাওয়া, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ সবই ঘরে বসে করা যায়। একসময় বালু মহাল নিয়ে বিশৃঙ্খলা ছিল, এখন একটি শাখার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরেছে তা না হলেও, অনেকটাই কমেছে।
সিনিয়র সচিব বলেন, একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক ভূমি প্রশাসন গড়ে তুলতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। সংবাদমাধ্যম যত বেশি দায়িত্বশীল ও পেশাদার হবে, ততই জনবান্ধব ভূমি সেবা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে। জনবান্ধব ভূমিসেবা কেবল সরকারি প্রচেষ্টায় নয়, গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমেই বাস্তব রূপ পেতে পারে। তাই গণমাধ্যমকে তথ্যের সেতু, জবাবদিহিতার রক্ষক ও জনস্বার্থের রক্ষাকবচ হিসেবে তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। সৎ স্বচ্ছ ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য মিডিয়ার সহযোগিতা/অংশীজন হিসেবে পাশে চাই।
অতিরিক্ত সচিব ইমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, অটোমেটেড ভূমি সেবার সুফল ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। মানুষ এখন ঘরে বসে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে পারছেন। ফলে রাজস্ব আদায় বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ৩৭৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ২৮৬ কোটি টাকা। ১৬১২২ নম্বর কল সেন্টারের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়া হচ্ছে; দৈনিক প্রায় আড়াই হাজার কল গ্রহণ করা হয়। এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভেন্ডর নির্ভরতা কমানো ও দুর্নীতি হ্রাস করে সুশাসন নিশ্চিত করা।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিএসআরএফ সভাপতি মাসউদুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক উবায়দুল্লাহ বাদল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুর রহমান, যুগ্মসচিব জহিরুল ইসলাম ও উপসচিব আমজাদ হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত সচিব এমদাদুল হক চৌধুরী।
এমআর/এফএ




