রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া এলাকায় বুধবার (৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে মাত্র ১০ সেকেন্ডে মারধর করতে করতে এক যুবককে প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাইভেটকারে তুলে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ওই যুবকের হদিস মেলে মিরপুর মডেল থানায়। তবে এ যুবককে অপহরণ করে প্রাইভেটকারে তুলে নেওয়ার ঘটনায় স্বজনরা ভয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। কিন্তু পুলিশের দাবি, তাকে মিরপুর এলাকার ছাত্রদল-যুবদল ও শিক্ষার্থীরা মিলে আটক করে থানায় হস্তান্তর করেছে।
বুধবার (৮ অক্টোবর) রাত ১১টা ৩২ মিনিটে লালমাটিয়া কলেজের পেছনের সড়ক থেকে একটি সাদা প্রাইভেটকারে করে তাকে তুলে নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
যুবককে তুলে নেওয়ার ঘটনায় একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাত ১১টা ৩২ মিনিট ৭ সেকেন্ডে একজন সাদা শার্ট ও হেলমেট পরিহিত ব্যক্তি এবং আরেকজন কালো শার্ট ও মুখে মাস্ক পরিহিত ব্যক্তি মিলে এক যুবককে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে মারধর করতে করতে টেনে-হিঁচড়ে একটি সাদা প্রাইভেটকারে তোলে। রাত ১১টা ৩২ মিনিট ১৭ সেকেন্ডের মধ্যে ওই যুবককে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। এ সময় কয়েক গজ দূরেই তার মোটরসাইকেলটি রাখা ছিল।
স্থানীয়রা আরও জানান, পরে তারা মোহাম্মদপুর থানায় খবর দিলে পুলিশ গাড়িটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এরপর বুধবার দিবাগত রাত ২টার দিকে মিরপুর থানার এক পুলিশ সদস্য মোহাম্মদপুর থানায় এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই যুবকের নাম ইঞ্জিনিয়ার তরিকুল ইসলাম তাহসান। তিনি রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের শেলটেক কম্পিউটার সিটিতে প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবসা করেন। পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি ব্যবসাও করতেন। তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী সদরের কান্ডপাশা খানাবাড়ি এলাকায়। তিনি মালেক ফরাজির ছেলে।
ভুক্তভোগী পরিবারের আতঙ্ক:
ভুক্তভোগী তরিকুলের চাচা আইনজীবী কামরুজ্জামান বলেন, তরিকুলের পরিচয় তিনি নিশ্চিত করেছেন। তিনি ঢাকা মেইলকে জানান, তরিকুল পেশায় একজন ব্যবসায়ী। গতকাল তাকে প্রাইভেটকারে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায়। গাড়ির ভেতরে তাকে মারধর করা হয়। তার ব্যাংক কার্ড ও টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা পর আমরা জানতে পারি, তরিকুল মিরপুর মডেল থানায় আছে। তিনি আরও বলেন, তরিকুল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মোহাম্মদপুরে বসবাস করতেন। তার ওপর নির্যাতন হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন, এতেই আমরা স্বস্তি পাচ্ছি।
বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে তার স্ত্রী কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি জানান, কথা বললে প্রাণনাশের আশঙ্কা আছে। আজ সন্ধ্যায় পুলিশ তাকে আদালতে নিয়ে আসে। কোন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে বা নতুন মামলা দেওয়া হয়েছে কি না তা জানা যায়নি। রবিবারের আগে কোনো কাগজ পাওয়া যাবে না। তাই মামলা সম্পর্কে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার রাতে লালমাটিয়া মহিলা কলেজের পেছন থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় সুজুকি জিক্সার মডেলের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেন মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্থানীয়দের তথ্যের ভিত্তিতে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। পরে মিরপুর থানার এসআই মাহমুদ থানায় এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। বিষয়টি ওসি স্যার জানেন।
পুলিশের বক্তব্যে ধোঁয়াশা:
এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানার ওসি কাজী রফিক আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের কাছে যুবককে তুলে নেওয়ার কোনো তথ্য নেই। তবে মিরপুর মডেল থানা পুলিশ মোহাম্মদপুর থানা থেকে ভুক্তভোগীর মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, মিরপুর মডেল থানার ওসি সাজ্জাদ রোমান বলেন, তরিকুলকে মিরপুরের স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল ও শিক্ষার্থীরা আওয়ামী লীগের মিছিলে জড়িত থাকার অভিযোগে ধরে থানায় হস্তান্তর করেছে। আসামির পকেটে মোবাইল, চাবি ও মানিব্যাগ ছিল। তিনি জানান, আসামি স্বীকার করেছে তার মোটরসাইকেল লালমাটিয়ায় রাখা আছে। আমরা জানতে পেরেছি আসামি মৎস্যজীবী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম-আহ্বায়ক। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা ওয়ারেন্ট নেই। তাকে আমরা হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছি।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুর থানা থেকে অপহরণের শিকার ব্যক্তির মোটরসাইকেল পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হলেও এ সংক্রান্ত কোনো জিডি থানায় হয়নি। এমনকি কোনো জিডি ছাড়াই থানা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে যান মিরপুর থানার এসআই মাহমুদুন নবী ও এএসআই সাইফুল ইসলাম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মাহমুদুন নবী বলেন, আমরা জানতে পেরেছি মিরপুর এলাকায় একটি মব সৃষ্টি হয়েছিল। রাতে আমি ডিউটিতে ছিলাম। পরে খবর আসে তরিকুল ইসলাম নামে একজনের মোটরসাইকেল মোহাম্মদপুর থানায় আছে। আমি এবং এএসআই সাইফুল ইসলাম মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে নিজেদের জিম্মায় মোটরসাইকেলটি মিরপুর থানায় নিয়ে আসি।
মবের ঘটনা মিরপুর এলাকায় হলেও ভুক্তভোগীর মোটরসাইকেল মোহাম্মদপুর থানায় কিভাবে এলো—জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিরপুর এলাকায় মব হয়েছে, এই বিষয়টি আমি জানি। তবে তার মোটরসাইকেল মোহাম্মদপুর থানায় কিভাবে এলো, তা আমি বলতে পারব না। থানা থেকে আমাদের জানানো হলে আমরা গিয়ে মোটরসাইকেলটি নিয়ে আসি। এর বেশি কিছু আমি জানি না। বিস্তারিত অফিসার বলতে পারবেন।
একেএস/এআর




