বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের পথে এগোচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করছে। তবে আগামী দুই দশকে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ শহরে বসবাস করবে। নগরায়ণ মূলত ঢাকায় কেন্দ্রভূত থাকায় যানজট, ঘনবসতি ও পরিবেশগত চাপ বেড়ে যাচ্ছে।
শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সোনারগাঁও এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) কনফারেন্স হলে ‘বাংলাদেশের সুষম নগরায়ন ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ’ শীর্ষক পরিকল্পনা সংলাপে এসব তথ্য উঠে আসে।
সংলাপে জানানো হয়, দেশের দ্রুত নগরায়ণের ফলে আগামী দুই দশকে শহরে বসবাসকারীর সংখ্যা ৬০ শতাংশ ছাড়াবে। রাজধানী ঢাকায় অতিরিক্ত ঘনবসতি ও আঞ্চলিক শহরের উন্নয়নের বৈষম্য নিরসনে বহুকেন্দ্রীক নগর উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করা জরুরি। সংলাপে পরিকল্পনাবিদরা আঞ্চলিক শহরগুলো—রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও সিলেট—প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র হিসেবে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সংলাপে আরও জানানো হয়, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প এলাকা এবং প্রশাসনিক সুবিধা শুধু রাজধানীতে নয়, বরং আঞ্চলিক শহরগুলোতেও স্থাপন করতে হবে। জনসংখ্যা বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোর শাখা আঞ্চলিক পর্যায়ে গঠন এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে ঢাকায় অভিবাসনের চাপ কমানো সম্ভব।
সংলাপে জানানো হয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো সমানভাবে আঞ্চলিক ও জেলা শহরে বিতরণ করা হবে। বড় হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটও আঞ্চলিক শহরে স্থাপন করা হবে। বিশেষভাবে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হবে এবং গ্রামীণ শিল্প ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হবে।
সংলাপে বলা হয়, জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, আঞ্চলিক পরিবহন নেটওয়ার্কের উন্নয়ন এবং “এক ঘণ্টার শহরনীতি” অনুযায়ী জেলা শহরের সঙ্গে আশেপাশের এলাকার উন্নত সংযোগ স্থাপন করা হবে। এছাড়া স্মার্ট সিটি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ব্যবহার, কমিউনিটি হাসপাতাল ও ডিজিটাল সেন্টার উন্নয়নের মাধ্যমে শহর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। শহরের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোও পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হবে। এ ধরনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন কার্যকর হলে রাজধানীর চাপ কমবে এবং দেশের সুষম নগরায়ন নিশ্চিত হবে।
বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় সংলাপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনাবিদ মোঃ আনিসুর রহমান তুহিন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- বিআইপি’র যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ তামজিদুল ইসলাম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালট্যান্ট ও বিআইপি’র ফেলো মেম্বার পরিকল্পনাবিদ মোঃ আনিসুর রহমান তুহিন, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ড-এর এমেরিটাস অধ্যাপক ও বিআইপি’র সম্মানিত সদস্য অধ্যাপক ড. এ টি এম নুরুল আমিন, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সিনিয়র প্ল্যানার ও উপপরিচালক পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাসেম, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম, বিআইপি’র সহ-সভাপতি ১ পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন, ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেড (ডিডিসি)-র পরিবেশ ও পরিবহন পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক পরিকল্পনাবিদ মাহবুবুর রহমান, বিআইপি’র কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মোঃ মুসলেহ উদ্দিন হাসান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পরিকল্পনাবিদ ড. ফরহাদুর রেজা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক পরিকল্পনাবিদ ড. ফৌজিয়া ফারজানা, বিআইপি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান, বিআইপি বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ উসওয়াতুন মাহেরা খুশি, বিআইপি বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ হোসনেআরা এবং নাগরিক ও পরিকল্পনা পেশাজীবী পরিকল্পনাবিদ আবু নাইম সোহাগ।
স্বাগত বক্তব্যে তামজিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ শহরে বসবাস করছে। আগামী দুই দশকে এই সংখ্যা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে নগরায়ণ মূলত ঢাকা ও আংশিকভাবে চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় ঢাকায় ঘনবসতি, যানজট, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকটের পাশাপাশি পরিবেশগত চাপ বেড়ে গেছে। আঞ্চলিক শহরগুলোতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য দেখা দিচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সমগ্র বাংলাদেশে সুষম নগরায়ন ও বিকেন্দ্রীকরণ অপরিহার্য।
পরিকল্পনাবিদ মো. আনিসুর রহমান তুহিন বলেন, বাংলাদেশে নগরায়ণ ১৯৬০-এর দশকে মাত্র ৫.১৪ শতাংশ ছিল, যা ১৯৯০ সালে বেড়ে ১৯.৮ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। নগরায়ণ সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন বিকল্প পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
অধ্যাপক ড. এ টি এম নুরুল আমিন বলেন, বাংলাদেশে আয়ের বৈষম্যের অন্যতম কারণ হলো এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ বাস্তবায়িত হলে নগরায়ণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যাবে এবং শহরে জনসংখ্যার চাপ কমানো সম্ভব।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের সিনিয়র প্ল্যানার পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাসেম বলেন, সুষম নগরায়ন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য। ‘ন্যাশনাল স্প্যাশিয়াল প্ল্যানিং’ ২০২৮ সালের মধ্যে তৈরি করা হবে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, সুষম নগরায়ন ও কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সারাদেশে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। অঞ্চলভিত্তিক কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে ঢাকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানো সম্ভব হবে।
বিআইপি সহসভাপতি সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন ‘জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামো’ বিষয়ে আলোকপাত করেন। এছাড়া অন্যান্য পরিকল্পনাবিদরা স্থানীয় দক্ষতা উন্নয়ন, নাগরিক সম্পৃক্ততা এবং জেলা ও আঞ্চলিক শহরগুলোর বিকাশে গুরুত্বারোপ করেন।
সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সুষম নগরায়ন ও বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয়। জেলা বাজেট প্রবর্তন ও জেলা ভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজধানীর ওপর চাপ কমানো সম্ভব। প্রতিটি জেলার জন্য পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
এএইচ




