শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ‘তিন নেতার মাজার’, ইতিহাস অনেকের অজানা

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:৪৫ পিএম

শেয়ার করুন:

S
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত তিন নেতার মাজার। ছবি- ঢাকা মেইল

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে বলা হয় রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র। এখানকার একপাশে সবুজ প্রাঙ্গণের বুকে দাঁড়িয়ে আছে সাদা গম্বুজে ঘেরা এক স্থাপনা ‘তিন নেতার মাজার’। নামটি অনেকের কানে পৌঁছালেও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখনো অনেকে জানেন না এখানে কারা শায়িত আছেন। 

অথচ এটি শুধুই একটি সমাধি নয়, বরং বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতীক। এখানে শায়িত আছেন তিন কিংবদন্তি নেতা শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমুদ্দিন। উপমহাদেশের রাজনীতিতে যাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। আজ তাদের স্মৃতি বহন করছে এই মাজার। বইয়ের পাতার নামগুলোকে বাস্তবে চোখে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে সোহরাওয়ার্দীর এই প্রাঙ্গণ।


বিজ্ঞাপন


শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক

শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক জন্মেছিলেন ১৮৭৩ সালে কলকাতার কাছাকাছি। আইনজীবী হিসেবেই তার কর্মজীবন শুরু হলেও দ্রুত তিনি রাজনীতির মাঠে নিজের জায়গা তৈরি করেন। কৃষক সমাজের উন্নয়ন, শিক্ষার প্রসার এবং রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য তিনি সাধারণ মানুষের কাছে অল্প সময়েই প্রিয় হয়ে ওঠেন। 

১৯৪০ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের অধিবেশনে যে প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন এ কে ফজলুল হক, সেটিই পরবর্তীতে ‘লাহোর প্রস্তাব’ বা ‘পাকিস্তান রেজোলিউশন’ নামে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। এজন্য তাকে উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি বলা হয়। তিনি ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন এবং পরবর্তীতে এই মাজারে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী


বিজ্ঞাপন


হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন গণতন্ত্রের এক জ্বলন্ত প্রতীক। ১৮৯২ সালে জন্ম নেওয়া এই নেতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, গণমানুষের রাজনীতির পক্ষপাতী এবং সবসময়ই সংবিধান ও আইনের শাসনের ওপর জোর দিতেন। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। 

সোহরাওয়ার্দীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল’ প্রস্তাব, যার মাধ্যমে তিনি পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা আলাদা না করে একত্রে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও এটি ইতিহাসে একটি সাহসী রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তিনি ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বেইরুটে আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। পরে তার মরদেহ দেশে এনে শের-এ-বাংলার পাশে শায়িত করা হয়।

খাজা নাজিমুদ্দিন

খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারে জন্ম নেওয়া এক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। ১৮৯৪ সালে জন্ম নেওয়া নাজিমুদ্দিন ছিলেন শিক্ষিত, মার্জিত ও ঐতিহ্যবাহী অভিজাত পরিবারের সন্তান। পাকিস্তানের জন্মের পর তিনি প্রথমে গভর্নর-জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন, পরে হন প্রধানমন্ত্রী। যদিও তাকে অনেকেই তুলনামূলকভাবে নরম-স্বভাবের রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখতেন। তবুও পাকিস্তানের রাজনীতির প্রথম যুগে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৪ সালের ২২ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকেও শাহবাগের মাজারে সমাহিত করা হয়।

মাজারের নির্মাণ ও স্থাপত্য

এই তিনজন নেতা রাজনৈতিক জীবনে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বীও ছিলেন, আবার কখনো কখনো সহযোগীও। কিন্তু তাদের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই তাদের সমাধি এক স্থানে সমাহিত করা হয়, যা আজকে দাঁড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ঐক্যের এক প্রতীক হিসেবে। বর্তমান জায়গায় মাজারটিকে নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। এর নকশা প্রণয়ন করেন স্থপতি মাসুদ আহমদ ও স্থপতি জহিরউদ্দিন। স্থাপত্যবিদ্যার দিক থেকে এটি ছিল সময়ের চেয়ে অগ্রসর। 

মাজারটির আকৃতি হাইপারবোলিক প্যারাবলয়েড ধাঁচের, যা একদিকে আধুনিকতা প্রকাশ করে, অন্যদিকে ইসলামিক স্থাপত্যের ছোঁয়াও বহন করে। ভেতরে সমাধিগুলো রয়েছে ভূগর্ভস্থ কক্ষে, আর উপরের অংশটি খোলা, যাতে যে কেউ প্রবেশ করে শ্রদ্ধা জানাতে পারে। কংক্রিট, মার্বেল আর সিরামিক টাইলসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই স্থাপনাটি এখনো ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।

তিন নেতার মাজার কেবল স্থাপত্য বা সমাধি নয়; এটি রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতীক। ১৯৪০-এর দশকের রাজনীতিতে এঁদের অবদান, পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাসে তাদের ভূমিকা এবং পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য তাদের সংগ্রাম সবই এক জায়গায় এসে মিশেছে এই মাজারে। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মত ও অবস্থান থাকা সত্ত্বেও তাদের দাফন এক স্থানে করা- এটি নিজেই একটি বার্তা দেয়। ইতিহাসবিদরা বলেন, এটি ঐক্যের প্রতীক; প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও শেষত তারা একই ইতিহাসের অংশ।

S2
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অবস্থিত তিন নেতার মাজার। ছবি- ঢাকা মেইল

আজও সাধারণ মানুষ আসেন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে। অনেকে পরিবার নিয়ে আসেন সন্তানদের ইতিহাস শেখাতে। কিন্তু একইসঙ্গে মাজারের রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতির কথাও শোনা যায়। পরিবেশ কখনো নোংরা থাকে, আশেপাশে অব্যবস্থাপনা চোখে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এটি ঢাকার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা, তাই এর সংরক্ষণে আরও উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তিন নেতার মাজারের চারপাশও ইতিহাসে সমৃদ্ধ। সঙ্গে লাগোয়া রয়েছে ঢাকা গেট, পাশে রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি। দোয়েল চত্বরের উত্তরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি যেন ঢাকার কেন্দ্রস্থলে ইতিহাসের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখান দিয়ে যায়, কেউ থেমে দেখে, কেউ আবার অগোচরেই পেরিয়ে যায়। কিন্তু যারা থেমে যায়, তাদের কাছে এটি ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার এক অনন্য সুযোগ।

শিক্ষার্থীদের কাছে এই মাজার একটি বাস্তব শ্রেণিকক্ষ। পাঠ্যবইয়ে পড়া নামগুলো এখানে এসে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে এটি এক অনুপ্রেরণার জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে তারা অতীতের নেতাদের সংগ্রামের কথা স্মরণ করেন। ইতিহাসবিদদের কাছে এটি গবেষণার ক্ষেত্র, যেখানে স্থাপত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতি একত্রে মিশে আছে।

আজ থেকে ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মাজারটি ঢাকার হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই পাল্টেছে, কিন্তু এই মাজার এখনো মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। শের-এ-বাংলার কৃষকপ্রেম, সোহরাওয়ার্দীর গণতান্ত্রিক চেতনা আর নাজিমুদ্দিনের শিষ্টাচার- সবই এখানে মিলেমিশে আছে।

তিন নেতার মাজার তাই শুধু একটি কবরস্থান নয়; এটি স্মৃতির স্তম্ভ, ইতিহাসের পাঠশালা এবং ভবিষ্যতের জন্য এক অনুপ্রেরণা। যে শহরে প্রতিদিন নতুন নতুন ভবন উঠছে, পুরনো স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে, সেই শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এই মাজার আমাদের বলে-ইতিহাস ভুলে গেলে ভবিষ্যৎ গড়ার পথও হারিয়ে যাবে। তাই তিন নেতার মাজার শুধু ঢাকার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।

মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, এই স্থানটি শুধু ইতিহাসের পাঠ নয়, বরং তাদের কাছে অনুপ্রেরণারও জায়গা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা বইয়ে পড়ি শের-এ-বাংলা, সোহরাওয়ার্দী কিংবা নাজিমুদ্দিনের নাম। কিন্তু এখানে এসে মনে হয় ইতিহাস যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে সামনে। বিশেষ করে লাহোর প্রস্তাব কিংবা গণতন্ত্রের আন্দোলনের কথা ভাবলে গর্ব হয়।’

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন ছাত্রীর ভাষায়, ‘নাজিমুদ্দিন হয়তো অনেকটা ছায়ায় ঢাকা পড়ে যান, কিন্তু তার অবদানও কম ছিল না। এখানে তিনজনকে একসঙ্গে শায়িত করা হয়েছে, সেটা আমাদের শেখায় ভিন্ন মত থাকা সত্ত্বেও ইতিহাস এক জায়গায় মিলে যায়।’

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দীর জীবনী পড়তে গিয়ে আমি বুঝেছি তিনি গণতন্ত্রের জন্য কত লড়েছিলেন। আজকে আমাদের দেশে যখন গণতান্ত্রিক চর্চার সংকট দেখা যায়, তখন এই মাজার আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে, সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না।’

অজানার বিস্ময়

পাশের রাস্তায় হেঁটে যাওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সত্যি বলতে কী, আমি এতদিন ভেবেছিলাম হয়তো এটা কোনো সাধারণ ধর্মীয় মাজার। কিন্তু আসলে এখানে কারা আছেন সেটা কখনো খুঁজে দেখিনি। আমাদের এত বড় নেতাদের কবর শহরের মাঝখানেই, অথচ আমি জানতাম না। মনে হচ্ছে আমাদের প্রজন্ম ইতিহাস পড়লেও বাস্তব জায়গাগুলো চেনার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছে।’

মোটামুটি মধ্যবয়স্ক এখন পাশের বসার জায়গা বসে আছেন। বিস্ময়ের জায়গা হলো তিনিও জানেন না এই মাজারটি কার। তিনি বলেন, ‘আমি তো জানতামই না এখানে কাদের কবর আছে। শুধু তিন নেতার মাজার নামটা শুনেছি । এখানে আসা বা এরকম ঐতিহাসিক জায়গা নিয়ে প্রচারণা খুব কম। তাই আমরা অনেকেই জানি না, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান শহরের মাঝখানেই আছে।’

তাদের এই বক্তব্য আসলে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। রাজধানীর এত কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকেও মানুষ যখন অজ্ঞাত থাকে, তখন বোঝা যায় আমাদের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্র কতটা দুর্বল।

এম/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর