রক্তদান: মানবতার কল্যাণে পাশে দাঁড়াচ্ছে মানুষ

প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২২, ১১:৩৪ এএম
রক্তদান: মানবতার কল্যাণে পাশে দাঁড়াচ্ছে মানুষ

কুলসুম বেগেম। লক্ষীপুর থেকে স্বামী দুলাল মিঞাকে নিয়ে এসেছেন ঢাকা মেডিকেলে। সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর যখম স্বামী কাতরাচ্ছে জরুরি বিভাগে। কর্তব্যরত ডাক্তার বললেন শরীর থেকে ইতোমধ্যে ঝরেছে অনেক রক্ত। করতে হবে অপারেশন। প্রয়োজন ৪ ব্যাগ এবি পজেটিভ ব্লাড।

কুলসুমের মাথায় তখন আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। দুই ঘণ্টা পরই স্বামীকে নেওয়া হবে অপারেশন থিয়েটারে। অন্যদিকে ডাক্তার বলেছেন- হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক নিরাপদ নয়। দুলাল মিঞার শারীরিক নানা জটিলটা থাকায় প্রয়োজন ডোনার। নিরাপদ না জেনেও হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে ছুটে যান তিনি। ব্যাংকে রক্ত না পেয়ে এদিক সেদিক ছুটতে দেখা যায় তাকে। একপর্যায়ে হাসপাতালের এক নার্সের কাছে খোঁজ পান ‘বাঁধন ব্লাড ব্যাংক’ এর। 

তখন বাঁধনের হটলাইন নাম্বারে যোগাযোগ করেন কুলসুম। এরপর তারাই রক্ত সংগ্রহ করে দেন। অপারেশনের পর দুলাল মিঞা এখন অনেকটাই সুস্থ।

দেশে রক্তের চাহিদাও যেমন আছে সেই সাথে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও এসেছে। ফলে মানবতার হাত বাড়িয়ে রক্ত দিতে ছুটেন বহু মানুষ।

‘ডোনেটিং ব্লাড ইজ অ্যান অ্যাক্ট অব সোলিডারিটি, জয়েন দ্য ইফোর্ট অ্যান্ড সেভ লাইভ’ অর্থাৎ রক্তদান একটি সম্মিলিত প্রয়াস, এই প্রয়াসে সংযুক্ত হন, রক্তদান করুন ও জীবন বাঁচান এই স্লোগানে সারা বিশ্বে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস।

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছ এই দিবস। রক্তদাতাদের সম্মাননা দেওয়া আরও সচেতনতা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। মানুষ যতো বেশি সচেতন হবে, অন্যের বিপদে হাত বাড়াবে তখন রক্তের অভাবে একটি প্রাণও শেষ হবে না মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

রক্তদাতা ব্যক্তিটি কিভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল সে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে কথা হয় কুলসুম বেগমের সাথে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, আমার ধারণাও ছিল না ছেলেগুলো আমার মতো একটা অপরিচিত মানুষের জন্য এভাবে ছুটে আসবে। রাত হওয়ায় আরও ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। এ মেডিকেলে এক সপ্তাহে মনে হল- এখানকার প্রতিটি কাজই টাকা না দিলে হয় না। ভোগান্তি তো আছেই। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেগুলো রক্ত দিল, টাকা তো নিলোই না একটু নাস্তাও খায়নি। এরই মধ্যে একবার দেখেও গিয়েছে। এমন সুসন্তানগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া, বলতেই কেঁদে উঠলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খলিলুল্লাহ পল্লব সোমবার (১৩ জুন) একটি উৎসব রেখে রক্ত দিতে ছুটে যায় হাসপাতালে। পল্লব বলেন, আমার রক্তের গ্রুপ সচরাচর অন্যদের সাথে মেলে না। উৎসব পরেও করতে পারবো, সবাই আনন্দ করেছে আমার তাতে আফসোস নেই, রোগীকে সময় মতো রক্ত দেওয়াতেই ভালো লেগেছে। দেরি হলে হয়তো কোনো ক্ষতি হতে পারতো।

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ একজন আরেকজনকে রক্ত দিচ্ছে কেউ হয়তো চেনেও না শুধু অনলাইনে বা সেচ্ছাসেবী সংগঠনের ডাকে অন্যের বিপদে ছুটে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু বাঁধনই নয়। ‘সন্ধানীর’ মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করছে অসংখ্য ব্লাড ব্যাংক। যারা স্বেচ্ছায় মেটাচ্ছে রক্তের চাহিদা। এছাড়াও রয়েছে অলাভজনক রিদম ব্লাড ব্যাংকের মতো সংগঠন। যারা অনবরত দিয়ে যাচ্ছেন সেবা। যাদের অনেকেরই রয়েছে অনলাইন প্লাটফর্মও। 

তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৯ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। যার ৩০ শতাংশ আসে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যেমে। বাকি ৭০ শতাংশ রক্ত গ্রহীতার স্বজন ও অপরিচিতরা দিয়ে থাকেন। দেশে নারীদের রক্ত দেওয়ার সুযোগ ও প্রবণতা কম। রক্তদাতাদের মাত্র ৬ শতাংশ নারী।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সূত্র বলছে, সারাদেশে সরকারিভাবে ২২৩টি ব্লাড ব্যাংক বা রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়াও দেশে গত তিন বছরে বিভাগ ও জেলার সরকারি হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রে (ব্লাড ব্যাংক) ২৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৩৭ জন স্বেচ্ছায় রক্তদাতার রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়েছে। এর বাহিরে অনিবন্ধিত অসংখ্য ব্লাড ব্যাংক এবং প্লাজমা সেন্টার রয়েছে। যাদের মূল লক্ষই সেবা দেওয়া। 

স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন বাঁধন প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২৫ বছরে সাড়ে নয় লাখ ব্যাগ রক্ত বিনামূল্যে সরবরাহ করেছে। এছাড়া ২০ লাখ ১৭ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দিয়েছে এই সামাজিক সংগঠনটি। আগামী ২৪ অক্টোবর সংগঠনটির রজতজয়ন্তী উদযাপন করার কথা রয়েছে। 

‘৫০ পেরিয়ে বাংলাদেশ, ২৫ এ বাঁধন, স্বেচ্ছায় রক্তদান হোক সামাজিক আন্দোলন’—প্রতিপাদ্য নিয়ে ২৫ বছর উদযাপন করছে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন। রক্তের প্রয়োজনে রোগীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বাঁধন অ্যাপস’ তৈরি, ২৫ বারের বেশি রক্তদাতাদের সম্মাননা, বাঁধন মিলন মেলা, স্যুভেনির প্রকাশসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সংগঠনটি। 

বাঁধন, রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এস এম কোরবান আলী বলেন, ‘একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন’—এই স্লোগান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলে একটি বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২৪ অক্টোবর যাত্রা শুরু করে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন। 

আগামী ২৪ অক্টোবর ২৫ বছর পূর্তি হচ্ছে সংগঠনটির। দীর্ঘ সময়ে নয় লাখ ৩৬ হাজার ব্যাগ রক্তদান হয়েছে। ২০ লাখ ১৭ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দেওয়া, করোনাকালীন প্লাজমা সাপোর্ট সেন্টারের মাধ্যমে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ৩২২ ইউনিট প্লাজমা প্রদান, করোনায় ৭৪১টি পরিবার ও ৫৪৫ জন ব্যক্তিকে খাদ্যদ্রব্য সহায়তা ও ৫৩ জন ব্যক্তিকে নগদ অর্থ প্রদান, ৩৮৬ পরিবার ও ৫৪৫ জন ব্যক্তিকে ইফতার সামগ্রী প্রদান, বাঁধন ট্রান্সফিউশন সেন্টারের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত সর্বমোট ১৪ হাজার ৩১১ ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করাসহ দেশের বিভিন্ন দুর্যোগের সময় নানা সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করে বাঁধন। দেশের ৫৩টি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের ৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৪০টি ইউনিট নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। বর্তমানে দুই হাজার ৪৪৩ জন সক্রিয় কর্মীসহ সাবেক কয়েক হাজার কর্মী কাজ করছে বাঁধনে।

‘বাঁধন অ্যাপসের’ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এটির মাধ্যমে কোনো মিডিয়া ছাড়া গ্রহীতা সরাসরি ডোনারের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। এটি নিয়ে আমাদের কাজ অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে। আশা করি ২৪ অক্টোবর অ্যাপটি আমরা চালু করতে পারব।’

রক্তদান সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি রিদম ব্লাড ব্যাংক এডমিন অফিসার মো. আবু হানিফ ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা যারা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়া কিংবা কাজ করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। একটা মানুষের সবচেয়ে আনন্দের জায়গা হল একটা মানুষ যখন অন্য মানুষের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসে। কারণ একটা মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আশা নিয়ে অনেক সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়। তখনি অনেক সময় ব্লাডের দরকার হয়। আর তখন আমাদের কাছে আসেন। আমরা তখন উৎফুল্ল হই যে, একটা মানুষের জীবন বাঁচাতে আমরা সহযোগিতা করতে পেরেছি। 

রক্ত দান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মহিউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, করোনা আসার পরে আমারা সবাইকে লকডাউন করেছিলাম। ঘরে থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলাম। যে কারণে মানুষরা হাসপাতালে ব্লাড ডোনেট করতে কম এসেছেন। ফলে করোনা কালে ব্লাড ডোনেশন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। যারা ব্লাড নিয়ে বেঁচে থাকনে, বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া রোগী তাদের অনেক বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে করোনা ব্লাডের মাধ্যছে ছড়াতে পারে।

তিনি বলেন, ব্লাড দেওয়ার মাধ্যেমে ডোনারের কোনো ক্ষতি হয় না, বরং উপকার হয়। তার শারীরিক পরীক্ষাগুলো হয়ে যায়। 

ধর্ম গবেষকরা বলছেন, মানবতার কল্যাণে মুমূর্ষুদের পাশে দাঁড়ানো পূণ্যর কাজ। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, কোরআন হাদিসে মানুষ মানুষের জন্য বিষয়ে কিছু জেনারেল রুলস আছে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে মানুষকে বাঁচানো। মানবকল্যাণ বা মানুষের কল্যাণ একটা অন্যতম মৌলিক এবাদত। মানব কল্যাণে দিয়েই রক্ত দানকে বৈধতায় আনা হয়েছে। 

ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেছেন তোমরা ভালো কাজ এবং তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করো। মন্দ কাজে তোমরা সহযোগিতা করো না। সূরা আল মায়েদাতেও এরকম বলেনছেন যে একজন মানুষেকে বাঁচালো সে যেন পুরো মানবজাতিকেই বাঁচালো। 

উল্লেখ্য, প্রতিবছরের ন্যায় আজ ১৪ জুন পলিত হচ্ছে বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হবে এই দিবস। ২০০৪ সাল থেকে নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করতে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দিনটির স্লোগান নির্ধারণ করেছে ‘ডোনেটিং ব্লাড ইজ অ্যান অ্যাক্ট অব সোলিডারিটি, জয়েন দ্য ইফোর্ট অ্যান্ড সেভ লাইভ’ অর্থাৎ রক্তদান একটি সম্মিলিত প্রয়াস, এই প্রয়াসে সংযুক্ত হন, রক্তদান করুন ও জীবন বাঁচান।

এ বছর বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজক দেশ মেক্সিকো। বিশেষ এ দিনকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে দেশটির রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে।

ডিএইচডি/এএস