রোববার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংসদে বিষোদগার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২২, ১০:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সংসদে বিষোদগার

পুলিশকে ট্রিগার হ্যাপি এবং দুর্নীতিপ্রবণ ও অত্যাচারী বলে অখ্যায়িত করে পুলিশ-র‌্যাবের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা। 

সোমবার (১৩ জুন) জননিরাপত্তা বিভাগ খাতে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় ব্যয় নির্বাহকল্পে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৭৮ কোটি ১৬ লাখ ২৯ হাজার টাকা মঞ্জুর করা নিয়ে ছাঁটাই প্রস্তাবে এসব কথা বলেন বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সদস্যরা।


বিজ্ঞাপন


বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, বাংলাদেশের পুলিশেরা কত বেশি ট্রিগার হ্যাপি তার সাম্প্রতিক সময়ে একটি জাতীয় পত্রিকার রিপোর্ট দেখে বোঝা যায়। এই সরকারের আমলে পুলিশ কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়, পরিণত হয়েছে দলীয় বাহিনীতে। এটা হাড়ে হাড়ে টের পাই এ সরকারকে ক্ষমতায় রাখার জন্য বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর এই বাহিনী দিয়ে কীভাবে নির্যাতন করা হয় তা দেখে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগ নেতার মধ্যে আলোচনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, সেখানে বলতে শোনা যায় আমি সরকারি দলের লোক, আমারতো সরকারি গুন্ডা আছে, আছে না। লাইসেন্সধারী। এটা কি বিরোধী দলের কাজ করবে নাকি আমি নির্দেশ দিলে তা বাস্তবায়ন করবে।

রুমিন ফারহানা বলেন, পুলিশ বাহিনী হত্যা গুম করে একইসঙ্গে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে এটি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে মানুষ যেন এই ধরনের বিপদ সহসা কোনো আওয়াজ না করে। এর বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে গেলেও তার বিরুদ্ধে নেমে আসে নির্যাতন।

তিনি একটি পত্রিকায় গত ১২ জুনের একটি প্রতিবেদনের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, রাজীব কর নামে এক ব্যক্তিকে পুলিশ বিনা অপরাধে তুলে নিয়ে যায়। তুলে নিয়ে যাবার সময় তার বাড়ি থেকে ২৮ ভরি সোনা এবং তার মায়ের চোখ অপারেশনের জন্য ৪৮,৩০০ টাকা , ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন নিয়ে য়ায়। পরে দুই লাখ টাকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনে তার পরিবার। 

তিনি পুলিশের একবারের নির্যাতনে তিনি তিনবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, তাকে ব্যাগ দিয়ে পেটানো হয়, বুট দিয়ে মুখ মাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং উলঙ্গ করে তাকে ইলেকট্রিক শখ দেওয়া হয়। পরে রাজিব কর আদালতের শরণাপন্ন হলে সেই (আইও) তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এমন হ্যাঙ্গামা হবে জানতে রাজিবকে বাঁচিয়ে রাখতাম না। এটা যদি হয় পুলিশের অবস্থা, তাহলে ভবিষ্যতে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনকারী পুলিশেরা অকথ্য নির্যাতনের লাইসেন্স পেয়ে গেল।


বিজ্ঞাপন


শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, রাষ্ট্রের মালিক কারা, রাষ্ট্রের মালিক হলো জনগণ। পৃথিবীর একমাত্র সংবিধান বাংলাদেশের সংবিধান যেখানে প্রথমেই উল্লেখ আছে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমরা কি সীমাবদ্ধ রাষ্ট্র, দায়বদ্ধ সরকার গঠন করতে পেরেছি। রাষ্ট্র যদি কোনো অন্যায় করে পুলিশ তখন চুপ থাকে। আর পুলিশ যদি কোনো অন্যায় করে সকল পুলিশ তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়ে। মানবাধিকার কমিশন চুপ থাকে। 

সংসদ সদস্য বলেন, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে জনগণের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আগে মানুষ রাজনীতিবিদদের কাছে যেত এখন সেখানে আর যেতে পারছি না।

শামীম বলেন, রাষ্ট্রীয় কর্মচারী জনগণের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে কিন্তু আমরা দেখতে পাই পুলিশ জনগণকে কর্মচারী হিসেবে মনে করে। মনে রাখতে হবে দেশের মালিক জনগণ। আমরা হচ্ছে সেই জনগণের প্রতিনিধি অর্থাৎ মালিকপক্ষের প্রতিনিধি। বাকি সবাই কর্মচারী কেউ কর্মকর্তা নয়। আর যদি কেউ মনে করে পুলিশি রাষ্ট্র জনগণ কর্মচারী সেটা ঠিক হবে না।

বিএনপির হারুনুর রশীদ বলেন, পুলিশ বিচার বিভাগের একটি অংশ। পুলিশ যখন সারা দেশে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বাদী হয় তখন নিঃসন্দেহে বোঝা যায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা কতটা নাজুক। সাবেক পুলিশের আইজিপি বলেছেন, ক্ষমতাসীনরা চায় পুলিশ তাদের কথামত চলবে সরকারি দলের অপরাধীদের ধরতে গেলে সরকারের পূর্বানুমতি লাগবে এই জায়গা থেকে যতক্ষণ পর্যন্ত না বেরিয়ে আসতে পারবো ততদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঙ্ক্ষি জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো না।

হারুন বলেন, পুলিশ বাহিনী নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় সম্ভব নয়। পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ, পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ, পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এটি অসত্য নয়। আর এসবের একটি কারণ ক্ষমতায় আমাদের থাকতেই হবে, ক্ষমতায় থাকার জন্য যা ইচ্ছা তাই করবো। পুলিশ বাহিনীকে আমরা সব ধরনের লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছি এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আজকে নির্বাচন কমিশন নামের যে সংস্থাটি রয়েছে সেটিকে রাখার দরকার নেই এদিকে বিলুপ্ত করে পুলিশ বাহিনীর হাতে দিয়ে দিলেই হবে। কী প্রয়োজন খামাখা এই নির্বাচন কমিশনের রাখা। প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের রূপকল্প পর্যন্ত যতদিন ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থাকার দরকার নাই। পুলিশের আইজিপিকে প্রধান করে তাদের অধীনে নির্বাচন দিন। প্রয়োজনে পার্লামেন্টের আইন করেন। এই বিষয়গুলোর যদি সমাধান করতে না পারি তাহলে এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটি অপচয় ছাড়া আর কিছুই না।

জাতীয় পার্টির বেগম রওশন আরা মান্নান বলেন, পুলিশ বাহিনী ভালো এবং খারাপ দুটি কাজ করে থাকেন। তবে খারাপ কাজের যদি বিচারের আওতায় আনা হয় তাহলে এটি অনেকাংশে কমে যাবে। প্রয়োজনে জব টেস্টের মাধ্যমে সেটাকে প্রমাণিত করা যেতে পারে। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনী অবশ্যই কিছু ভালো কাজ করছে তা না হলে দেশ একেবারেই অচল হয়ে যেত। কিছু খারাপ লোক সব জায়গায় থাকে তাদেরকে যদি শোধরানো যায় তাহলে আরো ভালো হবে। তারা মাদকের সঙ্গে জড়িত কি না সেটি প্রজেক্টের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হবে।

স্বতন্ত্র এমপি রেজাউল করীম বাবলু বলেন, পুলিশের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অপরাধ বোধ গড়ে উঠেছে। তারা এখন রক্ষকই যখন ভক্ষক হয়ে ওঠেছে। এসব পুলিশ বাহিনীকে ধরে ধরে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

টিএ/একেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর