রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ঢাকা

ভালো নেই সাভারের ট্যানারি মালিকরা

দেলাওয়ার হোসাইন দোলন, বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২৭ মে ২০২২, ০৭:৩৮ এএম

শেয়ার করুন:

ভালো নেই সাভারের ট্যানারি মালিকরা
  • ভালো নেই বেশিরভাগ ব্যবসায়ী
  • ঋণখেলাপি হয়ে কারও কারও কারখানা বন্ধ
  • শিল্পরক্ষায় সরকারের সহযোগিতা কামনা

চামড়াশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিবেশে উন্নীত করতে সাভারের হেমায়েতপুরে গড়ে তোলা হয়েছে চামড়া শিল্প নগরী। শুরুতে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে হাজারীবাগ ছেড়ে সাভারে যান ব্যবসায়ীরা। নতুন জায়গায় সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখলেও পাঁচ বছর আগে সাভারে উৎপাদনে যাওয়া ব্যবসায়ীরা খুব একটা ভালো নেই। হাতেগোনা কিছু বড় প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকিরা ধুঁকছেন। ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন অনেক মালিক। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছেন কেউ কেউ।


বিজ্ঞাপন


এমন পরিস্থিতির জন্য অবকাঠামোসহ সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করার আগেই ট্যানারি স্থানান্তর, জমির দলিল বুঝে না পাওয়া, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার সিইটিপিতে ভালোভাবে পরিশোধন না হওয়া, বিদেশি অনেক গ্রাহকের মুখ ফিরিয়ে নেয়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। চামড়া শিল্প নিয়ে দেশীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্তও দেখছেন কেউ কেউ। তাই দেশীয় এই শিল্পকে বাঁচাতে ব্যবসায়ীরা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

বিশেষ করে ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে লোন পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া, যাদের বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানির বিল বকেয়া আছে সেগুলো সময় দিয়ে ধাপে ধাপে নেওয়ার ব্যবস্থা ও সিইপিটির সক্ষমতা বাড়িয়ে পরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যথায় সম্ভাবনাময় এই শিল্পের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

যদিও ব্যবসায়ীদের এমন বক্তব্যে দ্বিমত আছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) কর্মকর্তাদের। তাদের দাবি, শুরুতে অনেক সমস্যা থাকলেও এখন ধীরে ধীরে ট্যানারি এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস নিরবিচ্ছিন্নভাবে দেওয়া হচ্ছে। 

বিসিক কর্মকর্তাদের দাবি, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিবেশসম্মত কারখানা গড়ে তুলতে জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র যারা পাচ্ছে তাদের লোনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


সাভারের ট্যানারি শিল্প এলাকার হালহকিকত সরেজমিন দেখতে সেখানে যায় ঢাকা মেইলের প্রতিনিধি দল। সেখানকার ব্যবসায়ী, এরসঙ্গে নিয়োজিত শ্রমিক, বিসিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছে ঢাকা মেইল। যা ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরা হবে। (আজ থাকছে প্রথম পর্ব)।

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত হলো চামড়া শিল্প। প্রতি বছর চামড়া রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে বাংলাদেশ। ১৯৫০ সালে সর্বপ্রথম পাকিস্তানিরা পুরান ঢাকার হাজারীবাগে ট্যানারি শিল্প গড়ে তোলে। মুক্তিযুদ্ধের পর ছোট-বড় মাঝারি সব মিলে প্রায় দুইশ’ ট্যানারি গড়ে তোলা হয় হাজারীবাগে।

৮০’র দশকে নানা কারণ দেখিয়ে স্থানীয় লোকজন ট্যানারি স্থানান্তরের আওয়াজ তোলেন। পাশাপাশি পরিবেশ ও চামড়ার বর্জ্যে বুড়িগঙ্গা পুরোপুরি দুষিত হয়ে যায়। পরে সরকার এটিকে সাভারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও ব্যবসায়ীরা কোনোমতেই হাজারীবাগ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। সবশেষ দফায় দফায় আদালতের আদেশের পর এক পর্যায়ে হেমায়েতপুরে যেতে বাধ্য হয় ট্যানারি মালিকরা।

২০০৩ সালে শুরু করা এই প্রকল্পের মেয়াদ ১২ বার বাড়ানোর পর ২০১৭ সালে শেষ করা হয়। এই সময়ে ১৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প বেড়ে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

অন্তহীন অভিযোগ ব্যবসায়ীদের

একাধিক চামড়া ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যে সময় হেমায়েতপুরে তারা এসেছেন তখন ভালো অবকাঠামোও গড়ে ওঠেনি। গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থাও পুরোপুরি ছিল না। ফলে হাজারীবাগে উৎপাদনে থাকা পণ্য পুরোপুরি সরবরাহ করতে না পারায় বেশিরভাগ মালিক ক্রেতা হারিয়েছেন।

অন্যদিকে জমি বরাদ্দের অনেক পরে কার্যক্রম শুরু হওয়ায় জমির দামও বেড়ে যায়। সেজন্য তাদের বেশি টাকার কিস্তি দিতে হয়েছে। এছাড়া কিস্তি পরিশোধ করার পরও এখনো অনেকে জমির দলিল বুঝে না পাওয়ায় ব্যাংক থেকে মর্ডগেজ লোন পাচ্ছেন না।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকটা থমকে আছে বেশিরভাগ ট্যানারি। ১৫ থেকে ২০টি ট্যানারি ভালো চলছে। বাকিগুলো ধুকছে। সম্পূর্ণ বন্ধও আছে অনেক ট্যানারি।

বিশেষ করে এপেক্স, রিলায়েন্স, সাবিনা লেদার, আঞ্জুমান, এবিএস ট্যানারি, আজমীর লেদার, খোকন ট্যানারি, সালমা লেদার ও সালমা ট্যানারি, বি এস লেদার, আল মদিনা ট্যানারিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে ট্যানারি সূত্রে জানা গেছে।

চৌধুরী লেদার, হেলাল ট্যানারি, করিম লেদার, লেসকো, ক্রিসেন্ট গ্রুপ, মিরাজ লেদার, মুক্তা ট্যানারি, ইব্রাহিম লেদার, রয়েল ট্যানারি, রওশন ট্যানারির মধ্যে বেশ কয়েকটা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কেউ আবার খুবই রুগ্ন অবস্থায় পার করছে।

স্কাই ফুটওয়্যার লিমিটেডের কর্ণধার প্রকৌশলী টি. এস. আইয়ুব ঢাকা মেইলকে বলেন, হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে যাওয়া ট্যানারিগুলো থমকে আছে। বেশিরভাগ ধুঁকে ধুঁকে চলছে। ট্যানারি মালিকরা যখন হাজারীবাগ থেকে মেশিনগুলো উঠিয়ে নিলেন, সেগুলো পুনরায় ব্যবহার উপযোগী ছিল না। অনেকেই নতুন মেশিন আনার চেষ্টা করেছেন। আমদানির অনুমতি না থাকায় আনতে পারেনি। ফলে বেশিরভাগ মেশিন পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এছাড়াও জমির দলিল বুঝে না পাওয়ায় অনেকে লোন করতে না পেরে বিপদে আছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্যানারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন ব্যবসায়ী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘হেমায়েতপুরের জমি এখনো ট্যানারি মালিকরা বুঝে পায়নি। অন্যদিকে চামড়ার ব্যবসায় যেহেতু মূলধন বেশি লাগে, শত শত কোটি টাকা দরকার। কিন্তু ব্যাংক লোন করতে না পারায় এত টাকা কভার করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া সিইটিপি নিয়ে অসন্তোষ থাকায় বিদেশি বড় বড় ক্রেতারাও আসছেন না।’

ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘বাইরে থেকে অনেক কিছু মনে হলেও বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেকে ঋণ খেলাপি হয়েছে। কেউ উৎপাদনেই যেতে পারছে না।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্যানারি মালিক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সত্যি একটা কঠিন সময় যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি আমরাও যে উদ্দেশে চামড়া শিল্প নগরীতে এসেছিলাম তার কিছুই পূরণ হয়নি। উৎপাদন কমে গেছে, বিদেশে ক্রেতা কমে গেছে। এখন টিকে থাকার জন্য লড়ছি।’

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এম আবু তাহের ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা ভালো নেই। কারণ নানামুখী সমস্যার মধ্য নিয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে। রাজউক রেডজোন তুলে না নেওয়ায় হাজারীবাগের জমি বিক্রি করা যাচ্ছে না। এখানের জমি বুঝে না পাওয়ায় লোন করা যাচ্ছে না। এখন একমাত্র উপায় সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। সরকার এই ব্যবস্থা করলে এই খাতের ব্যবসায়ীরা বাঁচবে।’

সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে একাধিকবার চেষ্টা করেও বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

ট্যানারি নিয়ে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবেশবিদদের সঙ্গে কথায় উঠে এসেছে, এখানে রাখা হয়নি সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে রিসোর্স জেনারেশনের ব্যবস্থা। নির্ধারিত সময়ের কয়েকবছর পর নির্মাণ করা হয় সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি)। যার কাজ দেয়া হয়েছিল চীনা ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে।

শুধু তাই নয়, সেই সিইটিপির পরিশোধন ক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বিশেষ করে কোরবানির সময়ে ট্যানারিগুলোর উৎপাদিত বর্জ্যের মাত্র অর্ধেক পরিশোধন করতে পারে সিইপিটি। যে কারণে সিইটিপিতে বর্জ্য পুরোপুরি শোধনের আগেই তা ফেলে দেওয়া হয় পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। ধলেশ্বরী নদীতে বর্জ্য পরে সেখানকার পানিও বুড়িগঙ্গার মতো নষ্ট করছে।

এমন পরিস্থিতির কারণে গত ২৩ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দূষণের কারণে চামড়া শিল্প নগরী বন্ধের সুপারিশ করে।

যদিও সিইপিটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দাবি, বর্জ্য শোধনের পর যে পানি নদীতে যায় তাতে ক্ষতিকারক কিছু থাকে না। অবশ্য এ নিয়ে নাম উল্লেখ করে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি এখানকার কোনো কর্মকর্তা।

যদিও কারখানার ভেতরকার পরিবেশও বিদেশি ক্রেতারা অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকের গাফলতি আছে বলে জানা গেছে। তবে ভেতরকার পরিবেশ ঠিক রাখতে নড়চড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়।

এদিকে তথ্য বলছে, সিইপিটির পরিশোধন সক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। কিন্তু কোরবানি ঈদের পর অনেক বেশি চামড়া প্রক্রিয়াকরণের সময় বর্জ্য উৎপাদন হয় প্রায় ৫০ হাজার ঘনমিটার। বছরের বাকি সময় ২৮ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদন করে ট্যানারিগুলো। ফলে বর্জ্যের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় পুরোপুরি শোধন করার আগেই তা ফেলে দেওয়া হয় ধলেশ্বরীর পানিতে।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বলছে, ট্যানারিগুলো প্রয়োজনের বেশি পরিমাণ পানি ব্যবহার করায় তা সিইটিপির শোধন ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে সলিড বর্জ্যকে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহার করলে এই সমস্যা সমাধান হবে।

বিসিক কর্মকর্তাদের দাবি, শুরুতে পরিপূর্ণ চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার সব ব্যবস্থা না থাকলেও এখন সেই অর্থে খুব বেশি সমস্যা নেই।

সাভারের বিসিক চামড়া শিল্প নগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান রিজওয়ান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘একটি পরিবেশবান্ধক চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তুলতে সর্বাত্মকভাবে কাজ চলছে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীসহ সবার দায়িত্ব আছে। আমাদের জায়গা থেকে সব ধরণের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি।’

বিইউ/ডিএইচডি/এমআর/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর