টগবগে ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ ও পাগলপ্রায় শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের মা কাজী মাখমিন শিল্পী। ১৮ বছর বয়সী ফাহমিন ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। গাজীপুরের টঙ্গী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তেন তিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় ভূমিকা রাখা ফাহমিন জুলাই বিপ্লবে শহীদ হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আন্দোলনের পক্ষে নিয়মিত লিখতেন তিনি।
১৮ জুলাই আন্দোলনে যাওয়ার আগে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ফাহমিন তার মাকে বলেছিলেন- আমি শহীদ হলে আমার লাশটা যেন গণভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তিনি ছাত্রদের দাবি আদায়ের পক্ষে উত্তরার আজমপুর এ বি সুপার মার্কেট এলাকায় যান। আন্দোলন অবস্থায় দুপুর সাড়ে ১২টায় ঘাতকের বুলেট কেড়ে নেয় তার প্রাণ। তার ওপর উপর্যুপরি গুলি করা হয়। ঝাঁঝরা হয়ে যায় পুরো দেহ। নিথর দেহটি অনেকক্ষণ পড়ে থাকে রাস্তায়। শহীদ হওয়ার সময় তার পরনে ছিল কলেজ ড্রেস। ঢাকার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে তার লাশ খুঁজে পায় পরিবার। তবে পরে পরিবারটিকে পোহাতে হয় নানা বিপত্তি। লাশ দাফনেও আসে বাধা। লাশ গোসল করাতে গেলে স্থানীয় মসজিদ কমিটি বাধা দেয়।
বিজ্ঞাপন
শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের বাবা শেখ আবু জাফর। নঁওগার আত্রাই থানার তারাটিয়া গ্রামে তাদের বাড়ি।
মায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ফাহমিন ছিলেন অত্যন্ত নরম স্বভাবের নিপাট ভদ্র ছেলে। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদকারী। কোনো অন্যায়কে তিনি কখনোই প্রশ্রয় দিতেন না। অসহায় দুস্থ মানুষকে তিনি সহযোগিতা করতেন।
শহীদ ফাহমিনের মা কাজী লুলুল মাখমিন শিল্পী বলেন, তার মানবিকতা ছিল এমন যে, ঈদের তিন দিন আগে কেনা নতুন পাঞ্জাবিটা সে পথশিশুকে বিলিয়ে দিয়েছে। টঙ্গী এলাকায় ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করে প্রকৃত মালিককে ফেরত দিয়েছে। অসীম সাহসী ও পরোপকারী হওয়ায় বেশ কিছু ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করে দিয়েছে ফাহমিন।
ফাহমিনের বাবা রাজশাহীতে সোনালী লাইফ ইন্সুররেন্স কোম্পানিতে চাকরি করতেন। তিন ছেলেসহ পরিবার নিয়ে কোনোমতে দিন কাটত তার। রাজশাহীর স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে টঙ্গী সরকারি কলেজে ভর্তি হন ফাহমিন। মাকে নিয়ে টঙ্গীতে মামার সঙ্গে থাকতেন তিনি। লেখাপড়ার খরচ তার মামারাই দিতেন। মাঝে মধ্যে ফাহমিনের বাবা অল্পস্বল্প টাকা পাঠাতেন।
চলতি বছরের জুলাইয়ে আন্দোলন শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই ছাত্রদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন ফাহমিন। ছাত্রদের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও নিয়মিত স্ট্যাটাস দিতেন তিনি।
শহীদ ফাহমিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তা মা বলেন, ‘আমার ছেলে বলতো, আমি মানুষ হতে চাই মা। তুমিও আন্দোলনে ভূমিকা রাখো। তোমাকে দেখে আরও দশটা মা যেন ছাত্রদের পক্ষে রাস্তায় নেমে আসে।’
মা বলেন, ‘ফাহমিন নিয়মিতভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। তাবলিগ জামাতে গিয়েছে তিন বার। ফাহমিন কখনোই আমার গোসলের কাপড় ধুতে দিত না। সে আমার গোসলের কাপড়-চোপর ধুয়ে দিত। আমাকে সেবা করত। আমি তার প্রতি অনেক খুশি। হাশরের ময়দানে ফাহমিনের সঙ্গে আমার দেখা হবে।’
আরও পড়ুন
২০০ বছর পরও সাঈদ-মুগ্ধদের স্মরণ করবে মানুষ: মাহমুদুর রহমান
পুলিশও বিচারের বাইরে না, যে দোষী তার বিচার হতেই হবে: সমন্বয়ক সারজিস
ফাহমিনের মা বলেন, আমার তিন ছেলের মধ্যে ফাহমিন ছিল সবার ছোট। সে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। আমার ছেলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছিল। তাকে কেন খুন করা হলো। পুলিশ একটা গুলি করলেই পারত। সেটা না করে এত এত গুলি করল কেন? আমি আমার তিন ছেলে এবং ভাইসহ সবাই আন্দোলনে ছিলাম। ছেলে মারা যাওয়ার পর আমরা ২৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত মাঠে ছিলাম।
অভাবী ও ক্ষতিগ্রস্ত শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের পরিবারের কেউ খোঁজ নেয়নি। সরকারি কোনো অনুদান বা সাহায্য সহযোগিতাও তারা পাননি। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের সহযোগিতা করেছে বলে জানান শহীদের মা।
সম্প্রতি ফাহমিনকে হত্যার অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। খুনিদের তিনি ফাঁসি চান না। তিনি চান, খুনিরা যেন ধুঁকে ধুঁকে মরে। ফাহমিনে মায়ের দাবি, পুলিশ তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছে। পুলিশের ওপর ক্ষোভ, এজন্য তিনি পুলিশের কাছে কোনো বিচার দেননি। তিনি বলেন, ‘পুলিশ আমার ছেলেকে গুলি করে মেরেছে। তাহলে পুলিশের কাছে বিচার চাইব কেন? খুনির কাছে খুনের বিচার হয় না।’
ফাহমিনের মা বলেন, ‘আমি কার কাছে বিচার চাইব। আমার অন্য দুই ছেলে এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তাদের এখানো ট্রমা কাটেনি। আমার কলিজার টুকরা। খুনিরা ধুঁকে ধুঁকে মরুক। ফাহমিন মারা যাওয়ার পর মেঝো ছেলে এখানো এডমিশনের পড়া শুরু করেনি। ছোটটা মানসিক অশান্তিতে আছে।’
এআইএম/জেবি




