গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি দাম হবে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’

প্রকাশিত: ২৩ মে ২০২২, ০৯:১৫ এএম
গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি দাম হবে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’
ছবি : সংগৃহীত

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা মানুষ। চাল, ডাল ও তেলসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও সেভাবে বাড়েনি মানুষের আয়। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষেরা। বিশ্লেষকদের মতে- এ অবস্থায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সেটা হবে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’। এমন সিদ্ধান্ত নিলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে সাধারণ মানুষের।

কয়েক মাস আগে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নসহ বেশকিছু অজুহাত দেখিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে কোম্পানিগুলো। সেই প্রস্তাবের ওপর গত ২১ থেকে ২৪ মার্চ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) উদ্যোগে চার দিনের একটি গণশুনানিও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আবাসিকসহ সব ধরনের গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। তিন মাসের মধ্যে কমিটির সিদ্ধান্ত জানানোর কথা রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে নতুন দাম। 

এদিকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে গণশুনানির সিদ্ধান্ত আসার আগেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ প্রস্তাব জানিয়েছে তারা। এনিয়ে ১৮ মে গণশুনানিও করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিপিডিবির প্রস্তাব- সরকার ভর্তুকি না দিলে পাইকারি মূল্যে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ৯৯ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য দাঁড়াবে ৮ টাকা ১৬ পয়সায়। তবে এই খাতে সরকার ভর্তুকি দিলে দাম অপরিবর্তিত (প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ১৭ পয়সা) থাকবে। 

বিপিডিবির মতে- গ্যাসের বর্তমান দাম বিবেচনায় বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে ৯ টাকা ১৪ পয়সা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ১২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলে ৯ টাকা ২৭ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্বই অনেকটা সংকটের মুখে পড়েছে। এর ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। ইতোমধ্যে যুদ্ধের প্রভাব দেখিয়ে কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে নিত্যপণ্যের দাম। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, পণ্য ঘাটতি ও বিমানভাড়া বৃদ্ধিসহ নানা অজুহাতে দাম বেড়েছে নিত্যপণ্যের।  বিশ্লেষকরা বলছেন- এ অবস্থায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা সরকারের জন্য আত্মঘাতি হবে। 

মহিউদ্দিন আহমেদ। ‘বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজ’ নামে একটি সংগঠনের আহ্বায়ক তিনি। সম্প্রতি ঢাকা মেইলের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, বাজারে সব ধরনের পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি। মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব সম্পূর্ণ গণবিরোধী। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু জনসাধারণ মিতব্যয়ী হলেও সরকারি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তা পরিহার করে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং অলাভজনক প্রকল্প নিয়ে জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করতে ব্যস্ত।’

অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালে রাস্তায় নামার ঘোষণা দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোও। এর মধ্যে কয়েকটি দল গণশুনানির পর থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। তর মধ্যে অন্যতম গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেছেন, ‘লুটপাটের টাকা জোগান দিতেই আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে। বাজারে যখন সব কিছুর দাম বাড়তি, জনজীবন নাকাল তখন পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়ার অর্থ হলো খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা তৈরি করা এবং তা বহুগাণিতক হারে সকল পণ্যের দাম বাড়াবে।’

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদে বাম গণতান্ত্রিক জোট। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বিদ্যুতে দুর্নীতি, অপচয় ও সিস্টেম লস দূর করা হয়নি। এ অবস্থায় খরচ বাড়ার অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব অন্যায্য, অন্যায় ও অনৈতিক। এ অযৌক্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ব্যয়ের টাকা জনগণ দেবে না।

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকে অযৌক্তিক, অগণতান্ত্রিক এবং অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া। তারা বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি জনগণের জীবনে নাভিশ্বাস তুলেছে। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে চরমভাবে যখন ব্যর্থ, তখনই দেশবাসী বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের শুনানিতে কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য ৫৮ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।’ 

এছাড়া গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালে হরতাল অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করলে সরকারের জন্য তা আত্মঘাতী পদক্ষেপ হবে বলে মন্তব্য করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্যা ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। সংগঠনটি বলছে, কোভিড ও ইউক্রেন পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, শিপিং ও পরিবহন ব্যয় অত্যধিক বেড়ে যাওয়ার প্রভাব আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় আমাদের রফতানি খাতের পক্ষে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, একদিকে আমাদের রফতানি শিল্পে উৎপাদন খরচ ব্যাপকভাবে বাড়া এবং অন্যদিকে রফতানি খাতে বিশ্বব্যাপী চাহিদা হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধিজনিত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে এবং বিদেশি মুদ্রা রিজার্ভের ওপরও পড়ছে। আবার সঞ্চয় কমে যাওয়ার ফলে বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের অর্থপ্রবাহে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এই দুঃসময়ে পাইকারি পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বহুমাত্রিক মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়ে এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার উদ্ভব হবে। ফলে কৃষি, শিল্প, সেবা এবং সার্বিকভাবে সাধারণ জনগণের জীবন ও জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি করবে। সর্বোপরি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের চলমান ধারা মারাত্মক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হবে। 

সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে এই মুহূর্তে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বিকল্প উপায়ে বিদ্যমান দর বহাল রাখার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

ক্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. এম শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা হিসাব করে দেখেছি- গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে আরও কমানো সম্ভব। অস্বাভাবিক সিস্টেম লস ও অনিয়ম কমানো গেলে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হয় না। সামগ্রিকভাবে ৮ শতাংশের ওপর সিস্টেম লস দেখানো হচ্ছে, বিশ্বের কোথাও ২ শতাংশের ওপর সিস্টেম লস নেই। এসব অনিয়ম যদি কমানো যায় তবে স্পর্ট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করতে হয় না। আর স্পর্ট মার্কেট থেকে আমদানি করতে না হলে দাম বাড়ানোর প্রসঙ্গ আসে না। 

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে শামসুল আলম বলেন, বিইআরসির কারিগরি টিমের করা বিদ্যুতের দাম ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। গণশুনানিতে আমরা কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছি। এসব প্রস্তাবগুলো গৃহীত হলে বাল্ক বিদ্যুতে ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি সমন্বয়ের পর তিন হাজার ৩৭২ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে।

টিএই/এইউ/এমআর