শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪, ঢাকা

যেদিন আমি মা হয়েছি সেদিন সব বদলে গেল

খালেদা পারভীন
প্রকাশিত: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

যেদিন আমি মা হয়েছি সেদিন সব বদলে গেল
ছবি : প্রতীকী

এক.
আমি সত্যিই বুঝতে পারছিলাম না যে আমার জীবনে কী আসবে, একটি দুঃখজনক কাজ করছি, কেবল আমি নিজের সম্পর্কে কী করবো তা না জেনে পেয়েছি—যেদিন আমি মা হয়েছি সেদিন সব বদলে গেল। আমি এই কথাটি সত্যই বিশ্বাস করি যে এই আশ্চর্যজনক শিশুরা বিশেষ মানুষের জীবনে জন্ম নেয়। কিন্তু এ জন্ম নেওয়াটা অনেকেই ‘অভিশাপ’ বলে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। যাদেরকে এই পৃথিবীতে রাখা হয়েছে তাদের সুরক্ষা ও যত্নের জন্য। আমি কখনই জানতাম না আমার সন্তানকে জীবনে না আনা পর্যন্ত আমি কতটা চেয়েছিলাম এবং সেখান থেকে আমরা একসাথে অবিশ্বাস্য অব্যক্ত যাত্রা শুরু করেছি। এই পথ কখনো বন্ধুর পথ। 

এটি এমন একটি লেখা, যে লেখাটির প্রতিটি পরতে পরতে একজন জন্মদাত্রী মায়ের ‘নিরব’ ও ‘অর্ন্তঘাত’ কান্না লুকিয়ে রয়েছে। যে কান্নাগুলো নিজের মনে করার মতো শক্তি কিংবা সাহস অনেকের থাকে না। সময় দ্যোতনার কাছে শুধু তা নিস্প্রভ। কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিদের জন্য নয়, যাদের শেখা-জানার অক্ষমতা সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা নেই এবং সম্ভবত সন্দেহ করা হয় যে, পুরো ব্যাপারটি আমাদের সমাজে দেবদূত, অথচ অসুস্থ সন্তান জন্মধারণে একটি অত্যধিক ভয়াবহ ঘটনা মনে হতে পারে, কিন্তু সমস্ত সাহস-শক্তির মাধ্যমে শক্তিশালীভাবে লড়াই করা একটি শিশুর পিতা-মাতার জন্যও কতোগুলো ঘটনা প্রতিনিয়ত যন্ত্রণাকাতর।


বিজ্ঞাপন


আমি এবং আমাদের পুরো পরিবার তৈরি থেকেছি সবসময় ওর পাশে থাকতে। ওর সুখকে আমাদের সুখ মনে করার চেষ্টা করেছি। অন্য দশজনের মতো করে তাকে ভাবার সুযোগ দিয়েছি, কিন্তু আমাদের পারিপার্শ্বিকতায় এটা একটা কঠিন ব্যাপার। আমরা যতটা সহজভাবে চিন্তা করতে চেয়েছিলাম, সমাজÑরাষ্ট্র কিংবা চারপাশ আমাদেরকে সেই প্রতিবেশটা খুবই কম দিয়েছে। তার জন্মের প্রায় সময় থেকে, আমি তাকে একা বড় করেছি। 

সবসময় পরিবারের সদস্যরা কাছাকাছি ছিল, কিন্তু তার প্রায় সব মাইলফলক চিন্তার জায়গায় ভীতিকর সব পরিস্থিতি যখন তার ছোট বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছিলো, আমি ওর যন্ত্রণাগুলো অনুধাবন করতে পারিনি সত্য, কিন্তু আমার বুকের ভেতরটা ফেটে গিয়েছে। তছনছ হয়ে গিয়েছে। একেকটি সময় ওর মলিন চেহারা আমাকে ভীষণভাবে কাতর এবং অসহায় করে তুলেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে ও অনেক কিছু বলতে চায়, আবার দেখি সে নিজের থেকে চুপচাপ হয়ে যায়, বলতে পারে না। চেপে রাখে। আমিও কখনো ওকে জোর করি নি। 
  
দুই.
একটা ছোট ছেলে কিভাবে আমাকে এতো কিছু শিখাতে পারে? আমার সন্তান এই পৃথিবীতে তার ছোট্ট জীবনজুড়ে আমাকে যা শিখিয়েছে তার একটি অন্তহীন তালিকা লিখতে পারতাম। কিন্তু কিছু কথা অলেখাই থাকুক। ওর কাছ থেকে সবচেয়ে বড় শেখাটা হচ্ছে, প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতেও প্রাণবন্ত থাকাটা। 

আমাদের শিশুরা সুপারহিরো। আমার ছেলে প্রতিদিন অনেক কিছু করে এবং প্রতিদিন সকালে তার ছোট্ট মুখে হাসি নিয়ে জেগে ওঠে। কিছুদিন আমি নিজেকে দোষ দিই, কিছুদিন অন্যকে দোষারোপ করি। আমি প্রশ্ন করি কেন এবং কি-ইত্যাদি। আমি একা অনুভব করতে পারি। আমি আমার সন্তানকে অন্যদের সাথে তুলনা করি। আমি ওর ভবিষ্যতের জন্য ভয় পাই। আমি আমার কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পেয়েছি যে কখনও কখনও, সবচেয়ে খারাপ দিন, বা এমনকি সেরা দিনগুলোতে একটি অন্ধকার ঘরে বসে কান্নাকাটি করা ঠিক আছে এবং যখন আমি শেষ হয়ে যাই, ওর চোখের তাকিয়ে নিজেকে আবার তুলে নিয়ে আমার চোখের জল মুছে ফেলি। সে হয়তো জানে না তার লড়াইটাও আমার প্রেরণা। আমার বার বার মনে হয়েছে, ও যদি পারে, তাহলে আমিও পারবো। আমি কখনোই ওকে চোখের আড়াল হ’তে দেইনি। সেও কখনো তার মায়ের আড়াল হয়নি। তার জন্মের পর কেউ কেউ তাকে বিদেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিলো, দত্তক হিসেবে চেয়েছিলো, আমি কখনো তাতে রাজি হইনি। আজ ওর ভাইরা ওকে অষ্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যেতে চায়, কিংবা ওর বন্ধুরা বিদেশে পাঠিয়ে দিতে বলে, সে রাজি হয় না। এর পেছনে রয়েছে দেশের প্রতি তার একটি গভীর মমত্ববোধ। 
  
তিন.
ও যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত, তখন এটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, যে তার পড়তে অসুবিধা হচ্ছে। বোর্ডের লেখাগুলো পড়তে ওর কাছে অস্বস্তি লাগছে, ওর ঝাপসা লাগছে। তখন বুঝলাম ওর লড়াইটা কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক ঘটনার ভেতরে তাকে যেতে হয়েছে। সে যেন বইয়ের সংস্পর্শে আসে, আমি তাকে পড়তে বলি। সাহায্য করি। তাকে বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে বলি, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সে যেন সৃজনশীল হয়ে উঠে, তার জন্য আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি, তার সামনে খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছি একটি উন্মুক্ত চর্চার পরিবেশ। যেখান থেকে সে নিজেকে গড়ার নির্যাস নিতে পারে। ওর মধ্যে যেন একটা স্বাধীনসত্তা গড়ে উঠে। এগুলো আসলেই ফলদায়ক। ওর মধ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তার সামনে একটা বিশাল দুয়ার খুলে যায়। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মাধ্যমে, সে একটি চিন্তাশীল, বুদ্ধিমান, মিষ্টভাষী ছেলে হয়ে ওঠে, যে বেশিরভাগ ‘বিশেষত্ব’ অর্জন করেছিলো, কিন্তু কোথাও কোথাও তার ভেতরে জড়তা ছিলো। এগুলো পুরোপুরি কাটানো কখনও সম্ভব নয়। ওর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেগুলো থেকে বের হওয়ার চেষ্টা আমরা করেছি, সে নিজেও অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু বের হতে পারে নি। এই সীমাবদ্ধতাগুলো ওকে বেশি আঘাত করে। ওর চাওয়া-পাওয়াগুলো খুবই পবিত্র, বরং আমরা তার দাম দিতে পারি নি। ঘরে-বাহিরে ওকে অনেকটা সময় একা একাই লড়াই করতে হয়েছে। আজ ওর যা কিছু অর্জন, এ অর্জনে আমরা হয়তো কিছুটা থেকেছি, সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পুরোপুরি কৃতিত্ব ওরই। ওর একাগ্রতা, ওর নিষ্ঠা, ওর স্বাধীনচেতা মনোভাব ওকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।  

অন্য কেউ জানে না, এবং আমি এটি সম্পর্কে জানি, ওর ভেতরে একটা চমৎকার মন রয়েছে, কিন্তু একটা অভিমান আছে, একটা একাকিত্ব আছে ওর মাঝে। আমি মেনে নিয়েছিলাম এটা। কিন্তু মা হিসেবে আসলে মেনে নেওয়াটা অনেক কঠিন। চোখের সামনে সন্তানের এমন শূন্যতা, চুপচাপ দেখাটা পাহাড়সম দুঃখ। কাজের চাপ এত বড় হয়ে গেল যে আমি তার সবকিছু পড়তে পারছিলাম না, এবং সেও আমাকে চাইবার জন্য খুব স্বাধীন হয়ে উঠছিল। অনেক সময়ে সে আমার উপলব্ধির চেয়েও বেশি উপায়ে ব্যর্থ হতে শুরু করেছে। আমি জানতাম যে আমার সাহায্য খুঁজছে, আমি ছাড়া সে একদমই নিঃস্ব। কিন্তু তবুও আমি ছেড়ে দিয়েছি, স্বাধীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে সময় দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবতা খুব ভয়ঙ্কর, এরা কখনও স্বাধীন হতে দেয় না। নিজের মতো করে ভাবতে ঠিক ততোটা প্রস্তুত হতে পারে না। আমি তখনও নিজেকে তার অক্ষমতার গভীরতা দেখার অনুমতি দিইনি।


বিজ্ঞাপন


আমি যে জিনিসগুলো শিখেছি এবং পথে চলার লড়াইগুলোতে এমন কিছু আছে, যা কখনই শেখানো যায় না, যদি না আপনি জুতা পরে একদিন হাঁটতে না পারেন। ওর এবং আমার মধ্যে একটি ভিন্ন স্তরের ভালোবাসা রয়েছে, যা আমি কখনোই জানতাম না যে আমরা মানবিকভাবে সম্ভব, এটি একটি জীবন পাঠ হিসেবে গড়ে তুলবো, যা চিরকাল লালিত থাকবে। আমরা দুজনেই বন্ধুর মতো থাকার চেষ্টা করি। অনেক কিছু নিজেদের মধ্যে শেয়ার করি। অনেক সময় আমরা দুইজন এক সঙ্গে নাটক দেখি, সিনেমা দেখি। কিংবা একটা বই ভাগাভাগি করে পড়ি। ওকে আমি আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওর মধ্যে ভয় কাজ করে। প্রচÐরকম শূন্যতা ওকে গ্রাস করে ফেলে। 

চার.
যখন চিকিৎসকের সামনে আমি ওর রোগ নির্ণয়ের কথা বলছিলাম, তখন তাকে আঘাত বা বিভ্রান্ত দেখাচ্ছিলো না। হয়তো তখনো সে বুঝতে পারে নি। যখন বুঝতে পারলো, তার মুখটা শিথিল এবং সে চিৎকার করে বললো, ‘আমি বোকা নই?’ যেদিন সে জানতে পারলো, তার সামনে একটা কার্ড দেওয়া হলো, এটাই তার পরিচয়, এ পরিচয়টা তার কাছে অনেক কষ্টকর। আমি তার মুখের দিকে তাকাতে পারি নি। নিজেকে তখন অপরাধী মনে হয়েছে। আমি এতোটাই অবাক হয়ে গেলাম যে আমি কাঁদতে শুরু করলাম। সে বাহ্যিকভাবে অনেক শক্ত থাকার চেষ্টা করে, খুব স্বস্তি নিয়ে বলে, ‘তুমিও কি চিন্তিত? আমি ভালো আছি।’ আমি আরো জোরে কাঁদলাম। ওর চেহারা সুন্দর নয়, কিন্তু ওর মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো খুবই মায়াবি। ওখান থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। হয়তোবা সন্তান হিসেবে ওর সম্পর্কে বেশি বলা হয়ে যায়। ওর কাছাকাছি যারা গেছে, বা যারা আছে, তারা নিশ্চয় আমার এ কথাগুলো বাড়াবাড়ি মনে করবে না। সে সবার সাথে মিশে না, কিন্তু আন্তরিকভাবে যার সাথে মেশে, তাকে খুব ভালোভাবে চাইবে, তার একজন হয়ে উঠবেই। সে সবসময় সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে চায়। সব সময় তার ভালোটাই চেয়ে এসেছে। 

গত কয়েক বছরে ওর কয়েকটি বড় অপারেশন হয়েছে। এ অপারেশনগুলো সহজ বা হালকা কিছু ছিলো না। একেকটি অপারেশন ১৪-১৫ ঘণ্টা ধরে হয়েছে। কোনো কোনো সময়ে আমরাও হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। ও হাল ছেড়ে দেয়নি। অসীম ধৈর্য্য আর কষ্ট সহ্য করে সে নিজেকে সামনে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। নিজেকে সারপ্রাইভ করে তুলেছে। 

এখন আমার বয়স হয়েছে, ওকে নিয়ে আমার প্রতিনিয়ত চিন্তা, আমার ভয় কাজ করে, আমার অবর্তমানে ওর কী হবে! যারা ওকে ভালোবাসে, সত্যি ওকে নিজেদের একজন মনে করে, তাদের আমি প্রায়ই বলি, ওকে দেখে রেখো। জানি না আমি, ওরা আমার আকুতিগুলো বুঝতে পারে কিনা। তার প্রতি অন্যান্যদের মিথস্ক্রিয়া আমাকে কৃতজ্ঞ করে তোলে। আমরা তার জন্য লজ্জিত নই, আমরা সহানুভ‚তি চাইনি, আমরা শুধু ওর পাশে থাকার সমর্থনটা চাই এবং সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। ওর প্রতি কেউ করুণা দেখালে, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। এই করুণা তার কাছে সবচাইতে বড় ঘৃণা। সবচাইতে বড় ভয়ও।  

ওর খুব ইচ্ছা আছে, এমন কিছু করা, যেটা আমাকে প্রায় বলে, ও এমন একটা আশ্রম করতে চায়, যেখানে অনাবিল শান্তি আর শান্তি থাকবে সবসময়। একটি চমৎকার নির্মল আবহ থাকবে। সম্পর্কের মধ্যে কোনো প্রশ্ন-টশ্ন থাকবে না। সবচাইতে পবিত্রতম ভালোবাসা ছড়াবে। সাম্য আর মানবতা হাত ধরাধরি করে অনন্ত পথ চলবে। আমি বিশ্বাস করি, কাঠামোগত আশ্রম করতে না পারলেও ওর স্বপ্নটা ছড়িয়ে দিতে পারবে।

খালেদা পারভীন ।। শিক্ষক

/এনএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর