গৃহশিক্ষকরা ‘কাব্যে উপেক্ষিত’, আইনের দিক থেকেও আড়ালে

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৪:৩৭ পিএম
গৃহশিক্ষকরা ‘কাব্যে উপেক্ষিত’, আইনের দিক থেকেও আড়ালে

শিক্ষক দিবস আসে-যায়। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় যারা পড়ান, শিক্ষক দিবসে সব আলো যেন তাদেরই। গৃহশিক্ষকরা ‘কাব্যে উপেক্ষিত’, আবার আইনের দিক থেকেও আড়ালে! তবু আমার জন্মভূমি মাইজদী এক জাদুশহর—তার হাজার স্মৃতিফলকের মধ্যে গৃহশিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্কের বোঝাপড়া আমার বহু আগে, আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে।  

ঘরে একজন মাস্টার মশায় রেখে আমাকে পড়ানো হতো। সাদা ফতুয়া কিংবা পাতলা গেঞ্জির সঙ্গে তিনি ধুতি পরতেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ; শীর্ণকায় শরীর ছিল তার। তখনও অনেক বৃদ্ধ তিনি। চোখে একটি পাওয়ারওয়ালা চশমা পরতেন। আবছা আবছা মনে পড়ছে তার কথা। প্রতিদিনই আমাকে পড়াতে আসতেন। নরেন্দ্র কুমার চক্রবর্তীর স্যারের কাছেই আমার হাতেখড়ি। তেঁতুলের বিচি দিয়ে তিনি আমাকে অংক কষাতেন। নামতা মুখস্থ করাতেন। অ, আ—শিখেছি তার কাছে। 

মাঝে মাঝে স্যারকে বসিয়ে রেখে আমি টেলিভিশন দেখতাম। অনেক জ্বালিয়েছি স্যারকে। কখনও একটি বকা দেননি। শুনেছি সহজ-সরল এই স্যার একসময় ধনাঢ্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তার অনেক সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়। 

আমি একটি শিক্ষক পরিবারের সন্তান। সম্মান, গৌরব—এসবের ভেতর আমরা সন্তানরা বেঁচেছিলাম চিরকাল। শিক্ষকরা সবসময় মাথাউঁচু করে বেঁচে আছেন। স্কুল পেরিয়েছি, কলেজ পেরিয়েছি, পেরুলাম বিশ্ববিদ্যালয়। এ ভ্রমণে অনেক শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি। একদিকে শাসন যেমন পেয়েছি, অন্যদিকে ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কটাকে রেখেছি বন্ধুত্বে। 

নেপাল স্যার, দীনেশ স্যার, অনিল স্যার, ফেরদৌস আপা, জবা আপারা ছিলেন আমার প্রাথমিক জীবনের শিক্ষক। স্কুল জীবনে পেয়েছি শিরীন আপা, মুকিমা আপা, অজয় স্যার, দেলোয়ার স্যার, চঞ্চল স্যার, ইকবাল স্যার, মাওলানা সুলতান স্যার, কাজী স্যার, মুকবুল স্যার, সাখাওয়াত স্যার। কখন যে তাদের প্রিয় হয়ে উঠেছি, টেরই পাইনি। যখন কোনো শিক্ষক, আমাকে তার প্রিয় ছাত্র বলেন, তখন বুকটা ভরে উঠে। কলেজ জীবনে বাশার স্যার, ইসমাইল স্যারের সান্নিধ্য পেয়েছি।  

পেরিয়েছে অনেকটা সময়, বদলেছে শহর-নগর—সুমহান। শিক্ষকতার দিন বদলেছে কি? বদলেছে তো। শরৎচন্দ্রের ‘পণ্ডিতমশাই’ উপন্যাসের বৃন্দাবন কেশবকে বলেছিলেন— ‘আমার পাঠশালায় একটি শর্ত আছে। প্রত্যহ বাড়ি যাওয়ার পূর্বে প্রত্যেক ছাত্রই প্রতিজ্ঞা করে, বড় হয়ে তারা অন্তত দুটি-একটি ছেলেকেও লেখাপড়া শেখাবে।’

খণ্ডকালীন শিক্ষকতা জীবনে মনে হতো, আমরা বোধহয় সেরকম ছাত্র তৈরি করতে পারছি না। বিপরীত পক্ষে পড়ুয়াদের আগ্রহও প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। চারপাশ তাকালে মনে হয়, এতো অবক্ষয় কীভাবে হচ্ছে। 

আসলে যাদের কেন্দ্র করে এই ‘শিক্ষক দিবস’, তাদের জীবন-দর্শনই আমরা অনেকে জানি না। তা হলে এ দিবস পালনের গুরুত্ব আমাদের অনুপ্রাণিত করবে কীভাবে?