পূজার স্মৃতি, শৈশবে ফেরার আকুতি

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৫২ পিএম
পূজার স্মৃতি, শৈশবে ফেরার আকুতি

এক.

আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে নোয়াখালীর মাইজদীতে। মাস্টারপাড়ায় আমার বড় হওয়া। আমাদের সেই পাড়ায় থাকত পাভেল, তার বোন স্বাতীদি। তাদের মা আমাদের মাসি। পাভেল আমার সঙ্গে পড়ত। ওর বাবা মানে—মেসো ছিলেন বাম-প্রগতিশীল চেতনার মানুষ। হঠাৎ করে তিনি মারা যান। 

মাসি একটি ব্যাংকে চাকরি করতেন। সারাদিন পাভেল, স্বাতীদির সঙ্গে কাটতো ভাই-বোনের মতো। আমাদের বড় হওয়াটা একসঙ্গে। একসঙ্গে আমরা খেলেছি। একসঙ্গে গান গেয়েছি। খেলাঘর করেছি। জীবনে প্রথম একটি গান লিখেছি, সেই গানটি সুর করেছিলেন স্বাতীদি।

যে পাড়ায় থাকতাম—সেই পাড়াটি ছিল হিন্দুদের আদর্শপাড়া। ছিল হিন্দুদের অধ্যুষিত। গুটিকয়েক মুসলমানদের বসবাস। কালধিক্রমে পাড়াটিতে মুসলমানদের আধিক্য বেড়েছে। এ এক অনায়াস ভ্রমণ, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জলপ্রাতের মতো তা মোহনায় এসে বাঁক বদলে ফেলে। 

উন্মুক্ত মাঠ, বিশাল ধানক্ষেত, হৃদয় জুড়িয়ে যেত দক্ষিণা হাওয়ায় এক সময়কার মাস্টার পাড়া। শিকড়ের গন্ধ পেয়েছি আস্তে আস্তে। সে দৃশ্যগুলো আজও আমার চোখের সামনে ভাসে। কখনও আবছা আলোর মিষ্টি সকাল। কখনও দুপুরে গনগণে রোদ। কখনও তুলশিতলায় পিদিম দেওয়া সন্ধ্যে বেলা। আমরা উলুধ্বনি শুনতাম, মাঝে মাঝে তুলসী গাছের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের প্রার্থনা শুনতাম।  

pic

এক সময় এ পাড়াটির নাম ছিল ঠাকুরবাড়ি। ১৯৬৩ সালে নোয়াখালী সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে আমার নানা প্রফেসর আবদুল জলিল এ পাড়ায় থাকা শুরু করেন। নানার প্রচেষ্টায় ও উদ্যোগে অন্যান্য শিক্ষকরা এখানে বসবাস করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তা প্রফেসর পাড়া, তারপর ‘মাস্টারপাড়া’ নামে লোকেমুখে প্রচার পেতে থাকে। 

দুই.

আমাদের আশপাশে যারা প্রতিবেশী ছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন ধর্মের দিক দিয়ে হিন্দু, কিন্তু আঁতুড়ঘরের এ মানুষগুলো চিরকালই প্রণম্য মানুষ; তারাই আমারই মাসি, আমারই মামা, আমারই ঠাকুমা, আমারই দিদি। আমরা খেলতাম আমাদের এই মামা, মাসিদের সঙ্গে, দিদিদের সঙ্গে; তারা তাদের বাচ্চাদের যেভাবে আগলে রাখতেন, ঠিক একইভাবে আমাদেরও আগলে রাখতেন। আদর করতেন, ভুল করলে আদর করেই বকা দিতেন, স্কুলে যাওয়ার আগে আমাদের সময় কাটত তাদের বাসায়; স্কুল থেকে এসে খেলতাম তাদের বাসায়। দুপুর বেলায় গোল হয়ে ভিসিআরে সিনেমা দেখতাম, এর মধ্যে খাওয়ার সময় হলে খাওয়া-দাওয়া করে নিতাম তাদের বাসায়, শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলতাম সন্ধ্যায় তাদের বাসায়।

ছোটবেলায় মা-বাবাকে চিন্তা করা লাগেনি আমাদের নিয়ে। জানতেন, আমাদের এই মামা-মাসিরাই দেখে রাখবেন। কখনো কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তো নাই! আমাদের কাছে আলাদা কেউ ছিল না। ছিল সবসময়কার আত্মীয়। ধর্মের কোনো ঘেরাটোপ কখনো আমাদের মধ্যে ছিল না।

তিন. 

শৈশব-কৈশোরের অন্যতম উৎসব ছিল শারদীয় দুর্গাপূজা। হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও এটা সর্বজনীন একটা ব্যাপার ছিল। ছোটবেলায় দেখতাম মণ্ডপে পূজা-অর্চনা চলছে, ঢাকঢোল বাজছে, নিজেদের উদ্ভাবনী দেখাচ্ছে অনেকে। এসব অনুষ্ঠান কারও জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না। দুর্গাপূজার সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। শরৎকাল প্রসন্ন সময়। শরতে প্রকৃতির সুন্দর মেজাজ লক্ষণীয়, যা অনেক ভালো লাগত। প্রকৃতির শুভ্রতার সঙ্গে মিশে থাকতাম আমরা।

pic

নগরলালিত হলেও আজও শরতের রূপ সমান মুগ্ধ করে। বর্ষার উদার দক্ষিণায় সম্পন্না প্রকৃতি তার যৌবনের সবটা লাবণ্য এ সময় ফুটিয়ে তোলে—সে একেবারে আকাশ থেকে পায়ের নিচের ঘাস পর্যন্ত। বর্ষার আচ্ছন্নতা কাটিয়ে প্রচ্ছন্নতার আড়াল ঘুচিয়ে হঠাৎ যেন আকাশ-পৃথিবীজুড়ে আলোর রহস্য বয়ে যায়। প্রকৃতির মহৎ ও নগণ্য প্রতিটি সদস্যই জেগে উঠে যেন সম্ভাষণ জানায়, ভাব বিনিময় করতে চায়।

চার. 

ছোটবেলার পূজার স্মৃতি আজও মনে পড়ে। দীর্ঘকাল ধরে এ রেশ আছে। কিছু মুহূর্ত আছে যা কালক্রমে কানে বেজে ওঠে। সময়ের পথ ধরে যথাসাধ্য পরিপাটি পোশাকে বন্ধু-বান্ধব মিলে পূজামণ্ডপগুলোতে ঘুরে বেড়াতাম। পূজায় আমাদের জন্য সন্দেশ তোলা থাকত। আমাদের বাসায় ভাড়া থাকতেন চন্দন নামে একজন ভদ্রলোক। একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরিতে করতেন। আমরা তাকে মামা বলতাম। যখন বাজি-পটকা কিনতেন, মামা আমাদের জন্যও কিনতেন। কত রকমের বাজি! পূজার সময় আমরা সেগুলো ফুটাতাম। 

পাড়া দাপিয়ে বেড়িয়েছি। লক্ষ্মীপূজা অথবা সরস্বতী পূজায় এ বাড়ি, ও বাড়ি ঘুরতাম। আর পূজামণ্ডপগুলোর আশপাশেই থাকতাম। চেয়ে থাকতাম মুগ্ধ চোখে প্রতিমার রূপ, দুর্গা মায়ের ঐশ্বর্য। কীর্তন, শ্যামাসংগীত শুনতাম। প্রাণ ছুঁয়ে যেত। 

চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ দল আসত পাড়ায়, রং-বেরঙের পোশাকে তারা নাচ-গান করত, অভিনয়ের কসরত দেখাত। তাদেরকে ‘ঢাঁকি’ বলা হয়। মনের ভেতরে বাংলা সংস্কৃতির শেকড় সংযোগ হতো।

pic

কয়েক বছর আগে, পাড়ার কয়েকজন শারদা সংঘ নামে একটি সংগঠন করেছে। তারা প্রতিবছর অরুণ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নান্দনিক অবয়বে পূজামণ্ডপ তৈরি করে। এ সংগঠন থেকে প্রতিবছর পূজায় বিশেষ প্রকাশনা প্রকাশিত হতো। ওখানে আমার লেখা থাকতো। মাইজদী বাজারে কথাসাহিত্যিক প্রণব ভট্টের পৈত্রিক বাড়িতে প্রতিবছর পূজা হয়। সেই পূজার বয়স এখন দ্বিশতাধিক। এ পূজা উপলক্ষে প্রণব ভট্ট চলে আসতেন এলাকায়। ব্যস্ত সময় কাটাতেন। 

আমার এখনও মনে আছে, হিন্দু বন্ধুরা পূজার সময় বিভিন্ন দোকানে, বাসায় চাঁদা তুলত। আমিও খুব উৎসাহ নিয়ে তাদের সঙ্গে চাঁদা তুলতাম। তাদের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করেছি।

পূজার সময় আমাদের বড় আকর্ষণ ছিল কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিচিত্র ভোজে পূর্ণ ঢাউস আকারের ঝলমলে ম্যাগাজিন—সানন্দা, আনন্দালোক, দেশ। পঁচিশ-ত্রিশ বছরের ব্যবধানে ভেতরের পাতাগুলোও মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। অসাধারণ মুখাবয়ব আর দৃশ্য-পরিস্ফুটন, কেবল কালি-কলমের রেখাঙ্কনে, কখনো সামান্য তুলির ছোঁয়া—কী যে জীবন্ত মনে হতো, যেন গল্পে-পড়া দৃশ্যটাই চোখের সামনে রয়েছে।

পাঁচ. 

উৎসব নিছক ধর্মে নির্দিষ্ট নয়। এর প্রকাশ আর ভঙ্গি বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের সমষ্টিগত উৎসবের আকৃতি। এ কথা সত্য, বাঙালিরা চিরায়তভাবে উৎসবে আচ্ছন্ন। ধর্মীয় উৎসব ব্যক্তির জীবনাচারণে যতোটা আনন্দের, তার চেয়ে সামাজিক বন্ধন প্রভাবিত করে চলে অনেক বেশি। এখানে কোনো ভেদাভেদ-বৈষম্য ছুঁয়ে যায় না। হিন্দুদের পূজা কিংবা মুসলমানদের ঈদ—সবাইকে অংশগ্রহণ করতে দেখেছি। কে হিন্দু—কে মুসলমান, তার কোনো প্রশ্ন ছিল না। 

habib

উৎসবের আমেজে মিশে গিয়ে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়। শৈশব-কৈশোরে উৎসবের রঙে নিজেকে রাঙানোর কথা স্মরণে আসে। সব মিলিয়ে শারদীয় দুর্গাপূজা আমাদের কাছে কোনো ধর্মীয় ব্যাপার ছিল না, ছিল উৎসবের। 

বাঙালি দুর্গাপূজায় মেতে উঠুক, উৎসবের রঙে রাঙুক, তখন সম্প্রদায়ের গ্রিল ভেঙে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে যাবে—এমনটাই হওয়া উচিত। রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হব, তার কথা ধার করেই বলি— ‘সংসারে প্রতিদিন আমরা সত্যকে স্বার্থের বিক্ষিপ্ততায় ভুলে থাকি, উৎসবের বিশেষ দিনে সেই অখণ্ড সত্যকে উপলব্ধির দিন, স্বীকার করার দিন।’ 

কারণ, উৎসব মানুষকে পরস্পরের সাথে মেলায়, এ যে সৌহার্দ্যবোধ, তাই রবীন্দ্রনাথ মনে করেন উৎসব ‘স্বার্থপরতার সুদৃঢ় জালকে অনায়াসে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিয়া দেয়।’

এনএম