‘শিক্ষকদের অনেক কিছু বলতে মানা’

মো. তৌহিদুল ইসলাম
প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০২:৪৫ পিএম
‘শিক্ষকদের অনেক কিছু বলতে মানা’

শিক্ষক শব্দটার সাথে আমরা প্রত্যেকেই খুব পরিচিত। আমাদের সবার জীবনে অসংখ্য শিক্ষক আছেন। আবার আমরা অনেকে নিজেরাও এখন শিক্ষক। জি, আমিও একজন শিক্ষক। বাংলাদেশের কাঠামোগত শিক্ষায় একেবারে প্রান্তিক স্তরের একজন শিক্ষক। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং আমার ভাষ্যমতে সবচেয়ে সুন্দর জেলা পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলায় একটা গহীন অঞ্চলের একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, বাচ্চাদের অ আ ক খ শেখানো আমার কাজ। 

২০১৩ সালে এই পেশায় আসি। সত্যি বলতে কি বাংলাদেশে শিক্ষক সম্প্রদায় সবচেয়ে কোণঠাসা সম্প্রদায়। আমাদের ভালো লাগা খারাপ লাগা কিছুই জনগণের সম্মুখে ব্যক্ত করতে মানা। আমাদের দুঃখ পেলে কান্না করা মানা, আমাদের রাগ হলে তা জাহির করতে মানা। কারণ? কারণ তো একটাই, আমাদের দেখে বাচ্চারা শেখে। বাচ্চারা স্বাভাবিকভাবেই অনুকরণপ্রিয়। আর তাদের জীবনে বাবা মায়ের পরে শিক্ষকরাই সবচেয়ে বেশি অনুকরণ যোগ্য হয়ে ওঠে। 

teacher

বর্তমান বাংলাদেশে একজন প্রাথমিক শিক্ষক আয়ের দিক থেকে সমাজের নিম্নশ্রেণির একজন মানুষ। কিন্তু এই নিম্ন আয়েই তারা গড়ে তুলছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। আমরা গড়ে তুলছি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ঐ যে বলেছিলাম আমাদের অনেক কিছু বলতে মানা। তাই আর এসব কথা বাড়াব না। একজন শিক্ষক হিসেবে একটা ভালো লাগার এবং হতাশার মিশ্র অনুভূতির গল্প শোনাব সবাইকে। 

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম যোগদান করি প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে। শুরুতে আসলে নিজেকে শিক্ষক হিসেবে খুব একটা মানানসই লাগতো না নিজের কাছেই। কিন্তু আস্তে আস্তে সময়ের সাথে পরিণত হয়েছি। নিজেকে শিক্ষক হিসেবে ভাবতে শিখেছি আর যখন থেকে নিজেকে শিক্ষক হিসেবে বিশ্বাস করতে শিখেছি তখন থেকেই শিক্ষার্থীদের সাথে সময় কাটানোটা উপভোগ করা শুরু করেছি। 

teacher

আমার শিক্ষকতা জীবনের প্রথম পঞ্চম শ্রেণির ব্যাচটা আমার এখনও অসম্ভব প্রিয় একটা ব্যাচ। ওই ব্যাচের প্রত্যেকটা ছেলে-মেয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি অন্যান্য কার্যক্রমেও বেশ প্রতিভাবান ছিল। তাদের মধ্যে একটা ছেলে ছিল জাহিদ নামে। ছেলেটা অসম্ভব ভালো ছাত্র ছিল না কিন্তু ক্রিকেটে তার মেধা ছিল সমীহ জাগানো। 

আমি নিজেও ক্রিকেট পাগল মানুষ হওয়াতে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম ছায়া হয়ে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একটা অঁজপাড়া গাঁয়ের দরিদ্র পরিবারের একটা ছেলে উপজেলা, জেলা পর্যায়ের ভীষণ কঠিন সব স্তর পেরিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ের ক্রিকেটের আলোতে চলে আসলো। 

teacher

খুব খুশি লাগছিল যেদিন জাহিদকে বিভাগীয় ট্রায়ালে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু বাইরে থেকে শিক্ষক হিসেবে আমি যতই সমর্থন দেই না কেন পরিবারের শিক্ষাটাই তো আসল তাই না? জাহিদের বেলায়ও তাই ঘটল। পরিবারের নৈতিকতা শিক্ষাদানে ব্যর্থতার ফলে ছেলেটা নিজেকেই নিজে হারিয়ে ফেলল। ১৮ বছর বয়স ছুঁতে না ছুঁতেই নিজে পছন্দ করে একটা বিয়ে করে ফেলল এবং বিয়ের পরে দরিদ্র পরিবারে যা হয় তাই হতে লাগল। ফলাফল ছেলেটা এখন দিনমজুর। অথচ ওর এখন থাকার কথা ছিল দেশের শীর্ষ স্থানীয় ক্রিকেটের আশেপাশে। ওর সমসাময়িক অনেকেই এখন এই পর্যায়ে আছে। 

গল্পটা কেন বললাম? আমাদের সমাজে অনেক প্রতিভাবান ছেলে আছে যারা পরিবার থেকে একটু সমর্থন পেলে নিজেকে এই সমাজে নানা উপায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে কিন্তু শিক্ষকদের চেষ্টা থাকলেও পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনার অভাবে ওরা হারিয়ে যায়। আর আমার মত শিক্ষকদের কাছে থেকে যায় একটা আক্ষেপের নাম হয়ে। জাহিদ নামটা আমার কাছে একটা আক্ষেপের নাম। 

teacher

একটা বাচ্চাকে আমরা শিক্ষকরা আসলে গ্রন্থগত শিক্ষাই দেই প্রধানত। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে বেশ অনেক শিক্ষক বাচ্চাদের সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখাতে পারি কিন্তু এই স্বপ্ন গুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটা সুন্দর সুস্থ পারিপার্শ্বিকতা এবং পরিবারের গভীর মনোযোগ। 

এই সামান্য কয়েকটা বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই দেশের ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ কান্ডারি হিসেবে সামনের সাড়িতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিতে পারবে অসংখ্য আজকের শিশু। শিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও দোয়া রইলো। 

লেখক: সহকারী শিক্ষক, বুড়িঘাট পূনর্বাসন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নানিয়ারচর, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা।

এনএম