‘পূজা মানে দুই মায়ের মুখ একসাথে দেখতে বাড়িতে যাওয়া’

শ্রীবাস চৌধুরী নিলয়
প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৩:০৫ পিএম
‘পূজা মানে দুই মায়ের মুখ একসাথে দেখতে বাড়িতে যাওয়া’

অবশেষে বর্ষা বিদায় নিয়ে শ্বেতশুভ্র শরতের আগমন ঘটল। শরৎ তার শুভ্র মেঘের ভেলার সাথে করে নিয়ে এলো শক্তিরূপা, সনাতনী, জগৎ জননী দেবী দুর্গা মায়ের আগমনীর বার্তা। এইতো মা তার ছেলে মেয়েদের সাথে করে কৈলাস থেকে ধরণীতে নেমে আসবেন। তাঁর পেছনে পেছনে লুকিয়ে আসবেন ভোলানাথ। ধরণীতে শুরু হবে মহা ধুমধামে দুর্গা মায়ের আরাধনা। 

পূজার স্মৃতিচারণ করতে গেলেই মনে পড়ে সেই ছোটবেলার কথা। প্রতিবার বছরের প্রথম দিনই আমার দাদাভাই বাড়িতে নতুন বৎসরের পঞ্জিকা নিয়ে আসতেন। দাদাভাইয়ের থেকে পঞ্জিকা নিয়েই প্রথমেই খুঁজে খুঁজে বের করতাম কবে দুর্গাপূজা? সেই থেকেই প্রতিদিন দিন গুনতাম পূজার কতদিন বাকী। কারণ তখন আমার কাছে দুর্গাপূজা মানেই ছিল পাঁচ দিন পড়াশোনা না করার আনন্দ। নতুন কাপড় পাওয়ার আনন্দ। আর পূজার পাঁচটি দিন প্রচুর লুচি, নাড়ু, সন্দেশ আর মিষ্টি খাওয়ার আনন্দ। 

বাড়িতে কাকা, পিসিমা এবং সকল আত্মীয়দের মিলনমেলা হতো। সবাই পূজা উপলক্ষে বাড়িতে আসতেন। ভাইবোনদের সাথে সারাদিন খেলতাম, পটকা পুড়তাম, একসাথে দলবেঁধে মণ্ডপে মণ্ডপে গিয়ে পূজা দেখতাম। 

puja

পূজা শুরু হয় মহালয়ায় দেবীপক্ষের সূচনার মাধ্যমে। ঐদিন বাড়ির সবাই ভোরে উঠেই টিভিতে মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখতে বসে যেতাম। আশেপাশের কয়েক বাড়ির মধ্যে আমাদের বাড়িতেই একটি সাদা-কালো টিভি ছিল। তাই মোটামুটি অনেক প্রতিবেশীরাই আমাদের বাড়িতে চলে আসতো টিভিতে মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখতে। সবার সুবিধার জন্য মা বারান্দায় টিভি সেট করে পাটি বিছিয়ে দিতেন। সবাই বসে টিভিতে মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখতাম। তারপর অনুষ্ঠান শেষে, সকলেই ভোর থাকতেই স্নান করে নিতেন এবং পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতেন। 

পঞ্চমীর দিন বাবা-কাকা এবং প্রতিবেশীরা সবাই মিলে আমাদের পাশের গ্রাম থেকে দেবী প্রতিমা আনতে যেতেন। ঐ গ্রামের পালদের কাছে আগেই প্রতিমা তৈরির জন্য বায়না দেওয়া থাকত। তারাও পঞ্চমীর দিনই প্রতিমা একদম পরিপূর্ণভাবে তৈরি করে রাখতেন। তাদের টাকা মিটিয়ে দিয়ে নৌকা করে প্রতিমা নিয়ে আসতাম বাড়িতে। 

আমি ছোট ছিলাম। তারপরও বাবার সাথে যেতাম। কারণ সবার আগেই আমাকে দেবী মায়ের মুখ দেখতে হবে। নয়তো ষষ্ঠীর দিন ছাড়া দেবীর মুখ খোলা হতো না। প্রতিমা বাড়িতে এনে সবাইকে মিষ্টি বা জিলাপি বিতরণ করা হতো। কি যে আনন্দ হতো! ঐদিনই রাতে আমরা বড়দের সাথে উপস্থিত থেকে সারারাত ধরে দেবীর মন্দির সাজাতাম। পরদিন সকাল থেকেই ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে দেবীর পূজার সূচনা হতো। 

puja

ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রচুর মজা করতাম। প্রতিদিন উপোষ থেকে পুষ্পাঞ্জলি দিতাম। পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার নিয়ম হচ্ছে উপোষ থেকে দিতে হবে। কিন্তু সকাল ঘুম থেকে উঠেই লুচি, নাড়ু বা খিচুড়ি খেয়ে ফেলতাম। তখন মা বলতো ছোটরা নাকি কিছু খেয়ে ফেললেও উপোষ ভাঙে না। খালি খাওয়ার পর স্নান করে নিলেই হয়। আমিও সাথে সাথেই স্নান করে উপোষ ঠিক রাখতাম। নতুন শার্ট আর প্যান্ট পড়ে পুষ্পাঞ্জলির জন্য রেডি হয়ে যেতাম। এখন ঐদিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আর মাকে বললে মা আর আমি একসাথে হাসি। 

পূজায় আমার একটি বিশেষ পারদর্শিতা ছিল ঢাকের সাথে কাশর বাজানো। এখনো বাড়িতে আমিই প্রতিবছরই ঢাকের সাথে কাশর বাজাই। দাদাভাই আমার কাশর বাজানোয় মুগ্ধ হয়ে সবসময়ই আমাকে বিশ/ত্রিশ টাকা বখশিশ দিতেন। এখন আমার দাদাভাইও বেঁচে নেই, বখশিশও পাই না। 

ছোটবেলার স্মৃতির মায়া কাটিয়ে এখন বড় হওয়ার পর আমার কাছে দুর্গাপূজা মানে বাড়িতে মায়ের কাছে যাওয়া। জীবনের তাগিদে পরিবার ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় থাকি। কত সময় পার হয়ে যায় মাকে দেখি না। তাই এখন পূজা মানে দুই মায়ের মুখ একসঙ্গে দেখতে বাড়িতে যাওয়া। একসঙ্গে দুই মায়ের স্নেহাশিস পাওয়া। অনেকদিন পর মায়ের সঙ্গে প্রচুর সময় কাটানো। মায়ের হাতের তৈরি সব বেষ্ট মিষ্টান্ন খাওয়া। টিউশনির সামান্য পরিমাণ টাকা জমিয়ে মায়ের জন্য টুকটাক কিছু কিনে নিয়ে যাওয়া। এইটাই আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি। 

puja

আরেকটি প্রাপ্তি হলো, পূজায় জন্য ছোটবেলার সকল বন্ধুদের কাছে পাওয়া। সকল বন্ধুরাই নিজেদের জীবনে ব্যস্ত। কোথাও না কোথাও সকলেই পড়াশোনা করে, চাকরি করে। অন্তত পূজার এই সময়টাতেই সবাই একসঙ্গে বাড়িতে আসি। প্রতিদিন দেখা হয়, আড্ডা দেই। সব বন্ধুরা মিলে মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে প্রতিমা দেখি। এইতো জীবনের সার্থকতা। 

দেবী মায়ের কাছে তাই মনের আশা, উনি প্রতিবছর যেন মর্তলোকে নেমে আসেন। আমাদের মহিষাসুররূপী অন্যায়ের প্রতিরোধ করার শিক্ষা ও ক্ষমতা দান করেন জন্ম থেকে জন্মান্তরের জন্য। 

লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এনএম