স্মৃতিতে পূজা

‘ছোটবেলায় পূজা মানেই ছিল নৌকায় করে মেলায় যাওয়া’

সাধন রায়
প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০২:১৩ পিএম
‘ছোটবেলায় পূজা মানেই ছিল নৌকায় করে মেলায় যাওয়া’

বাবা মায়ের চাকরির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই বরিশালে বড় হওয়া, কিন্তু সারাবছর অপেক্ষায় থাকতাম কবে পূজার ছুটি হবে আর সবাই মিলে গ্রামের বাড়িতে যাব। বছরজুড়ে অন্যান্য ছুটি থাকলেও, দুর্গাপূজার ছুটিই ছিল মূল আকর্ষণ। কারণ, এই ছুটিতেই কাকারা, পিসিরা, ভাই-বোন সবাই মিলে এক হতাম গ্রামের বাড়ি নড়াইলে। 

বাবা-মা দুজনেই কলেজের প্রভাষক হওয়াতে আমাদের দুই ভাইবোন আর মা-বাবার ছুটি প্রায় একইসঙ্গে শুরু হতো। যেদিন স্কুলে গিয়ে জানতে পারতাম কাল থেকে পূজার ছুটি শুরু, সেদিন স্কুল থেকে বাসায় এসেই দুই ভাইবোন মোটামুটি ব্যাগ গোছানো শুরু করে দিতাম আর অপেক্ষায় থাকতাম কখন বাবা মা বাসায় ফিরবে কলেজ থেকে। ষষ্ঠীর দিনই বেশিরভাগ সময় রওনা দিতাম বাড়ির উদ্দেশে। 

কাকারা, পিসিরা সবাই প্রায় একইদিনে বাড়ি পৌঁছতাম। ঠাকুমা রান্না করে নিয়ে, বাড়ির বারান্দায় অথবা উঠোনে বসে অপেক্ষা করতেন আমাদের জন্য। ষষ্ঠীর দিন বাড়িতে প্রায় মেলা শুরু হয়ে যেত। কাকা- কাকী, পিসি, ভাই-বোন সবাই মিলে প্রায় ১৮-১৯ জন মানুষ হতো বাড়িতে। সবাই মিলে একসঙ্গে উঠোনে খেতে বসতাম শীতল পাটিতে।

puja

সপ্তমীর দিন সকালে উঠেই প্রথম কাজ হতো, নারকেল কোড়া, মিষ্টি, গুড়, চিড়া-মুড়ি আর দুধ দিয়ে সকালের খাবার খাওয়া। সকালে খাবার পর্ব শেষে সবাই বসতাম নতুন জামাকাপড় নিয়ে। সবাই নিজের নিজের জামাকাপড় ভাগ করে নিতাম। এরপরে এক এক করে স্নান সেরে নতুন জামাকাপড় পরে ফেলতাম। নতুন জামা পরেই প্রথম কাজ ছিল লাইন ধরে প্রণাম করা। প্রণাম করা মানেই প্রণামী।
বড়রা একে একে প্রণামী দিত,তারপর গুনতাম কার কত টাকা হল। 

প্রণামীর টাকা পেয়ে নিজেকে বেশ বড় বড় লাগত। সারাবছর ফাঁকা পড়ে থাকা মানিব্যাগটায় এই সময়েই কিছু টাকা ঢুকত।

বিকেলের দিকে বের হতাম সবাই মিলে বাড়ির আশেপাশের মণ্ডপ দেখার জন্যে। মণ্ডপে গিয়ে পাপড় ভাজা, আর চানাচুর খাওয়া ছিল প্রধান কাজগুলোর একটা। ঘুরেফিরে মিষ্টি আর ভাজাভুজি কিনে বাড়ি ফিরতাম।

puja

অষ্টমী ছিল পূজার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিন। অষ্টমীর দিন সকালে উঠেই সবাই স্নান করে আগে অঞ্জলি সেরে নিতাম। অষ্টমীতে লুচি-ডাল থাকত সকালের খাবার। খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিতাম কারণ দুপুর গড়ালেই নৌকায় করে পূজো দেখতে যেতে হবে। 

আমাদের বাড়ির পাশেই ভৈরব নদী। অষ্টমীর দিন বিকেলে নৌকা ভাড়া করে সবাই মিলে একসঙ্গে এক নৌকায় পূজা দেখতে যেতাম। আমরা ছোটরা নৌকার মধ্যিখানে গোটগাট হয়ে বসতাম আর বাবা-কাকারা মিলে বৈঠা বাইত। আর আমরা ভাই-বোনরা মিলে গান ধরতাম। মাঝে মাঝে আবদার করতাম বৈঠা বাওয়ার, তবে বড় নদী দেখে কখনোই তা করতে দেয়া হত না। 

পূজা মণ্ডপের পাশেই মেলা বসত। মেলা থেকে মাটির ঘোড়া, নৌকা আর হাতে ঠেলা গাড়ি এগুলো কেনা ছিল অবশ্য কর্তব্য। পূজো দেখে রাতে আবার নৌকায় করেই ফিরতাম। ফেরার সময় আমরা ছোটরা সবাই প্রায় ঘুমিয়ে যেতাম। আমাদের কোলে করে নৌকায় উঠাতো বাবা-কাকারা।

puja

নবমীর দিন সকালে উঠেই কেমন যেন সবার মন খারাপ হয়ে যেত। কারণ, পরেরদিন দশমী। আর দশমীতে পূজাও শেষ সাথে ছুটিও। বেশিরভাগ সময় দেখা যেত দশমীতেই ফিরতে হতো বাড়ি থেকে। দশমীর দিন সকাল থেকেই বাড়ি ফাঁকা হওয়া শুরু হত। সবাই এক এক করে বেরিয়ে পড়তাম যে যার গন্তব্যে। ঠাকুমা কাঁদতেন উঠোনে দাঁড়িয়ে।

ছোটবেলায় পূজো বলতেই ছিল বাড়ি গিয়ে এক হওয়া, আর নৌকায় করে পূজা দেখতে যাওয়া। এখন পূজা আসলে কেমন যেন ফাঁকা একটা অনুভূতি কাজ করে। প্রচন্ড মিস করি বাড়ি গিয়ে এক হওয়া, মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা আর ধূপের গন্ধের সাথে ঢাকের শব্দ। আগের মতো আর বাড়িতে যাওয়াও হয় না সবার। ঠাকুমাও এখন আর আগের মত সুস্থ নেই আর বাড়িতেও থাকেন না। 

ভাই-বোন সবাই এখন ক্যারিয়ার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। ফলত, পূজা এখন বেশিরভাগ সময় বরিশালের বাসায় বসেই কাটে অথবা বন্ধুদের সাথে ঘুরে। সময় যায় আর তারসঙ্গে বদলায় মানুষের জীবনের ঘটনাক্রম, আর ঘটনাগুলো ধরা দেয় স্মৃতি হয়ে।

লেখক: শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস

এনএম