মঙ্গলবার, ২৮ মে, ২০২৪, ঢাকা

পাঞ্জাবি বিক্রেতা রফিকের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প 

নিশীতা মিতু
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:৫৯ পিএম

শেয়ার করুন:

পাঞ্জাবি বিক্রেতা রফিকের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প 

অর্থ আয়ের জন্য কেউ চাকরি করেন। কেউবা বেছে নেন ব্যবসা। কেউ কেউ আবার চাকরি ছেড়ে হয়ে যান পাক্কা ব্যবসায়ী। এমনই একজন তরুণ রফিকুল হাসান। পুরুষদের পোশাকের অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘মিক’ এর কর্ণধার তিনি। 

বর্তমানে চাকরি আর ব্যবসা দুটো সামলালেও কদিন পরেই চাকরি ছেড়ে দেবেন এই তরুণ। তার ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্প জানিয়েছেন আমাদের। 


বিজ্ঞাপন


রফিকের জন্ম সাভারে। ছোটবেলা থেকেই ঢাকায় থাকেন তিনি। বেড়ে ওঠা উত্তরাতে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে স্নাতক শেষ করেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রোফেশনালস (বিইউপি) থেকে। পড়েছেন ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিষয়ে।

meek

বর্তমানে ব্যবসার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেলস ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসবে কর্মরত রয়েছেন রফিক। তবে জানালেন, খুব তাড়াতাড়িই চাকরি জীবনে ইতি টানছেন। অক্টোবরে নতুন আউটলেট খুলতে যাচ্ছেন। এরপর ব্যবসাতেই পুরোপুরি মন দেবেন। 

অনলাইন ব্যবসায়ে আসার গল্প শুনতে চাই। রফিক বলেন, ‘করোনার সময় অনলাইন ব্যবসা শুরু করি। আমাদের ৪ বন্ধুর একটা কোচিং সেন্টার ছিল। করোনার কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে কিছু একটা করার প্রত্যাশা থেকে টিউশনের, পকেটমানির জমানো টাকা থেকেই ব্যবসা শুরু করি। সঙ্গে বন্ধুর কিছু জমানো টাকাও ছিল।


বিজ্ঞাপন


meek

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে যাত্রা শুরু করে ‘মিক’। প্রথমে শার্ট, পোলো শার্ট দিয়ে শুরু করে, পরে পাঞ্জাবি নিয়ে কাজ করেন। গ্রাহক জনপ্রিয়তায় পাঞ্জাবি বেশি এগিয়ে থাকায় পরবর্তীতে পাঞ্জাবি নিয়েই কাজ করেন রফিক। বর্তমানে প্রতিনিয়ত পাঞ্জাবি ম্যানুফ্যাকচার করছেন। মিকের প্রধান বা সিগনেচার পণ্য এখন পাঞ্জাবি। 

অবশ্যই পছন্দের যথেষ্ট কারণও রয়েছে। সাধারণ পাঞ্জাবির তুলনায় মিকের পাঞ্জাবিগুলো কিছুটা ভিন্ন বলা হয়। ভিন্ন ডিজাইন, ভালো ম্যাটেরিয়াল আর সুলভ মূল্যের হওয়ায় ক্রেতারা এসব পাঞ্জাবি লুফে নিচ্ছেন। 

meek

নিজের জমানো ২০ হাজার টাকা আর বন্ধুর জমানো ১০ হাজার টাকা মূলধনে ব্যবসা শুরু করেন রফিক। বর্তমানে একেক মাসে আয় একেকরকম থাকে। সাধারণত ২০ হাজারের কাছাকাছি মাসিক আয় হয়। যেসব মাসে পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি থাকে সেসব মাসে আয় ৩০ হাজারও হয়ে থাকে। 

ব্যবসার ক্ষেত্রে ক্রেতার সঙ্গে সমন্বয়কে কেমন চোখে দেখেন? জানতে চাইলে রফিক বলেন, ‘ব্যবসাতে কাস্টমার খাতির করতে না পারলে কেউ টিকতে পারবে না। ক্রেতার সঙ্গে সমন্বয় ব্যাপারটা আসে কাস্টমার খাতির থেকে। আর অনলাইন বিজনেস অনেক বেশি প্রতিযোগিতা, তাদের বিশ্বাস অর্জন একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বাংলাদেশ ই-কমার্স সেক্টরে এখনও বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারেনি। তাই ক্রেতার সাথে সার্বক্ষণিক একটা আত্নীয়তার বন্ধন গড়ে তুলতে হয়।’ 

meek

ব্যবসা করতে গেলে নানা অভিজ্ঞতা জমে। তেমন স্মৃতিচারণ করেই রফিক বললেন, ‘আমি তখন নতুন বিজনেস শুরু করা। এক ক্রেতা আমাকে বলল পাঞ্জাবি লাগবে, অ্যাডভান্স পেমেন্ট করে নিবে। আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে। তিনি আমাকে বলল যে- বিকালের মধ্যেই টাকা পাঠিয়ে দিবে। আমি সুন্দরমতো তাকে বিশ্বাস করে পাঞ্জাবি কুরিয়ার করে দিলাম। কুরিয়ার করার পরেও দেখি টাকা দেয় না। কী করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি হাল ছেড়ে দিয়ে মনে করলাম যে আর পাঞ্জাবির টাকা পাব না। অনেক বার ফোন দিলাম, ফোন বন্ধ। আমি আর কুরিয়ারে দৌড়াদৌড়ি করলাম না। ভাবলাম গেছে যাক। ৩ দিন পরে সেই ব্যক্তি নক দিয়ে বললো যে তার মোবাইল হারিয়ে গিয়েছিল, ফোন অফ ছিল, টাকাটা দিতে পারেনি, পরে টাকাটা বিকাশ করে দিলো।’

‘আরেকটি খুম মর্মান্তিক ঘটনা যা না বললেই নয়। এক মেয়ে ক্রেতা তার প্রিয়জনের জন্য পাঞ্জাবি অর্ডার করলো- গিফট করবে। আমাকে বললো- সুন্দর করে র‍্যাপিং করে, গিফট বক্সের মতো করে দিতে পাঞ্জাবি দুইদিন পরে নিবে। অ্যাডভান্স পেমেন্ট করে দিলো। আমি যেদিন ডেলিভারি দিব তার আগের দিন রাতে আপু মেসেজ দিল যে ভাইয়া- পাঞ্জাবিটা লাগবে না। আমি বললাম আপু কেন কী হইছে? আমাকে বললো- ভাইয়া, যার জন্য পাঞ্জাবি নিতে চেয়েছিলাম, সে আর পৃথিবীতে নাই। আজও আপুর সেই টাকাটা দেওয়া হয়নি, আর বললেও সাহস পাইনি। আমি এক প্রকার ঋণি থেকে গেলাম।’

ব্যবসা করতে এসে পরিবার থেকে আর্থিক সাহায্য না পেলেও মানসিক সাহায্য পেয়েছেন এই তরুণ। শুরুর দিকে বাবাই ছিলেন সবচেয়ে বড় ক্রেতা। উপহারের জন্য, ঈদের জন্য— যে কোনো প্রয়োজনে ছেলের কাছ থেকেই পাঞ্জাবি কিনতেন তিনি। 

meek

কেবল নিজেকে নিয়ে নয়, নতুন উদ্যক্তাদের নিয়েও ভাবেন রফিক। তিনি বলেন, ‘যারা বেকার তাদের সুযোগ করে দিচ্ছি বিনা পুঁজিতে প্রোফিট শেয়ারিং করে বিজনেস করার। আমার পাঞ্জাবির সব দায়ভার আমি নিয়ে তাদেরকে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিচ্ছি। আমরা যেটাকে রিসেলার বলে থাকি। বর্তমানে আমার প্রায় ১২ জন রিসেলার একটিভলি কাজ করছে। তারা প্রতিনিয়ত ভালো অর্ডার আনছে।’ 

‘ভবিষ্যতে আমার প্লাটফর্ম বড় হবে এবং এখান থেকেই বেকার কিন্তু কর্মের প্রতি ভালোবাসা আছে এমন তরুণদের সফলতার সিঁড়িটা আমাদের সঙ্গে শুরু হোক এটাই চাই। আমার নিজস্ব প্লাটফর্ম আছে- Panjabi House (পাঞ্জাবি ঘর)। যেখানে সবার জন্য উন্মুক্ত অনলাইন মার্কেট প্লেস হয়েছে, যারা নিয়মিত পোস্ট করে বিনা খরচে ভালো অর্ডার আনতে সক্ষম হচ্ছে। কাস্টমার গ্রুপ গড়ে উঠছে, এখন ৮৫ হাজার মেম্বার আছে এবং প্রতারক মুক্ত প্লাটফর্ম, কাস্টমার যেমন সঠিক দামে সঠিক পণ্য পাচ্ছে। তেমনি বিক্রেতারাও বিনা খরচে সেল করতে পারছে, এইভাবে ধীরে ধীরে ভীষণ নিয়ে এগিয়ে চলছে। আমার প্রায় ৮০% সেল এই Panjabi House গ্রুপ থেকেই আসে, আলহামদুলিল্লাহ’— যোগ করুন রফিক। 

meek

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এই তরুণ বলেন, ‘আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা- নিজেই ম্যানুফ্যাকচার করবো, নিজের গার্মেন্টস হবে, সেই গার্মেন্টসে নিজের ব্র‍্যান্ডের পাঞ্জাবি সারাদেশে ছড়িয়ে দিব। দেশের ৬৪টা জেলাতে আউটলেট থাকবে যেখানে আমার গার্মেন্টস-এ উৎপাদিত, আমার ব্র‍্যান্ড-এর পণ্য সেল হবে। দেশীয় মার্কেটকে অগ্রাধিকার দিয়েই এগিয়ে যেতে চাই। নিজের উদ্যোগকে সারাদেশেই ছড়িয়ে দিতে চাই। সৃষ্টিকর্তা যেন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার তৌফিক দেয়।’

এনএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর