নৃত্যকলা বিকাশে রোল মডেল মনিরা পারভীন

মো. শাহিন রেজা
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:০০ এএম
নৃত্যকলা বিকাশে রোল মডেল মনিরা পারভীন

বিকাল ৫টার সময় বিটিভিতে যাওয়া কথা থাকলেও পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় প্রায় ৬টা বেজে যায়। আগে থেকে প্রডিউসার রুমা আপু পাস দিয়ে রাখায় ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা না করে দ্রুতই প্রবেশ করতে পারি। তখন ৩ নম্বর স্টুডিওতে একটি অনুষ্ঠানের শুটিংয়ের প্রস্তুতি চলছে যা পরবর্তীতে প্রচার করা হবে। 

স্টুডিওতে ঢুকতেই দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন মনিরা পারভীন তার শিক্ষার্থীদের স্ক্রিপ্ট ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কিছু সময় পর শুটিং শুরু হলো। এবার চোখে পড়ল অদ্ভুত কিছু ঘটনা। 

monira

একটি অনুষ্ঠান সাফল্য মন্ডিত করতে তার সবটুকু প্রচেষ্টা আমি মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকলাম। সামনে থেকে নির্দেশনা দেওয়া, স্ক্রিনে কেমন লাগছে তা দেখা, সবার নাচ ও অভিনয় কেমন হচ্ছে তা তদারকি করা দেখে মনে হলো খুব নিখুঁত একটি পারফরম্যান্স তিনি প্রত্যাশা করছিলেন। শুটিংয়ের শেষে বুঝতে পেরেছি তার চাওয়ার থেকে প্রাপ্তির পাল্লা ভারি ছিল। 

আমি শুধু দেখছিলাম তার কর্মতৎপরতা। ফলে এতোটুকু ধারণা করতে পরেছি বাংলাদেশের নৃত্যকলার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে তার নাম সবার আগে থাকবে। তবে এই সফল নারীর চলার পথ এত সহজ ছিল না। চেষ্টা ও শ্রমের মাধ্যমেই নিজের অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন তিনি। 

monira

ছোট থেকে নৃত্যের প্রতি অনুরাগ, কাজে প্রতি নিষ্ঠা, সততা ও ভালোবাসা সমস্ত বন্ধুর পথ মসৃণ করে আজ তাকে সম্মানের জায়গায় নিয়ে এসেছে। 

২০১৫ সালে মনিরা পারভীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। এরপর ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে বিভাগের চেয়ারপার্সন হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভাগের উন্নয়ন, খেলাধুলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশসহ নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সময়ের কাজ সময়ে করা, ইতিবাচক চিন্তা, সাংগঠনিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষার্থী বান্ধব কর্মকাণ্ডের কারণে সবার কাছে এখন তিনি রোল মডেল।

monira

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র আপু হওয়ায় পরিচয়টা বেশ অনেক আগের। আমি বরাবরই তার স্নেহধন্য। একদিনের ঘটনা মনে পড়ছে। তিনি খুব সকালে বিভাগে এসে ক্লাস, ভাইভা ও প্রশাসনিক কাজ সেরে দুপুরের পর চলে গেলেন খেলার মাঠে। আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল খেলায় তার মাঠে উপস্থিতি নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্যম তৈরি করেছিল।

পুরোটা সময় জুড়ে মাঠে থেকে খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করেছিলেন। ফলস্বরূপ ঐ দিন নৃত্যকলা বিভাগ জয়লাভ করে। এরপর রওনা হয় সংসদ ভবনের উল্টো পাশে রিহার্সালে। প্রায় ৩ ঘণ্টার রিহার্সাল শেষে বাড়ি ফিরছিলেন রাত ১১টায়। আমি প্রায় পুরোটা সময় তার সঙ্গে ছিলাম।

monira

শিক্ষার্থীদের প্রতি তার স্নেহময় ভালোবাসা ও মমতা সত্যিই অতুলনীয়। সেদিনের অনুষ্ঠানও শেষ হতে ১২টা বেজে যায়। শুটিং সেটে তাকে কখনো রাগ করতে দেখিনি। প্রয়োজনে কয়েকবার শট নিয়েছেন। পুরোপুরি গোছানো একটি মানুষ তিনি। কাজের প্রতি এমন সততা ও নিষ্ঠা আমি কম মানুষেরই দেখেছি। 

গত মাসে তার বেশ কয়েকটি প্রোগ্রাম দেখেছি। সবগুলো ছিল অন্যদের থেকে ভিন্ন। কারণ তিনি সবসময় কাজে মধ্যে ঢুকে থাকতে পছন্দ করেন। সঙ্গে নতুন চিন্তা, কর্মপন্থা ও ভিন্ন উপস্থাপন কৌশল এনে দিয়েছে সাফল্য। 

monira

শোকাবহ আগস্টের ২২ তারিখে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি নৃত্যনাট্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর প্রযোজনায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন মনিরা পারভীনের পাণ্ডুলিপি, নৃত্যভাবনা, নৃত্য পরিকল্পনা, নৃত্য পরিচালনা ও পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হয়। পরিবেশনায় ব্রিটিশ আমলের পূর্ব থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে দাঁড় করানোর পরিকল্পনা দেখানো হয়েছিল। 

১৯৪৭ সাল থেকে ৭১'র আগ পর্যন্ত ৫২'র ভাষা আন্দোলন, ৬৬'র ৬ দফা এবং ৬৯'র গণ-অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ ভূমিকা, ১৯৭০ সালের নির্বচন, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধু যে দূরদর্শী ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন তা নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে সুনিপুণ ভাবে তুলে ধরা হয়। মূলত মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান এবং ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখানোর সঙ্গে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখানো হয়।

monira

আমি সেদিন জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠানে চলা অবস্থান পিনপতন নীরবতা লক্ষ্য করেছি। রুমভর্তি দর্শক এর আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বক্তৃতাতে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানতে পারলেও নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে এমন অসাধারণ উপস্থাপন হয়ত এর আগে দেখেনি। 

এ ধরনের স্বতন্ত্র অনুষ্ঠান পরিকল্পনার সবটুকু অবদান মনিরা পারভীন এবং তার নৃত্যায়ন সংগঠনের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সর্ব কনিষ্ঠ চেয়ারপার্সনের পদ অলংকৃত করা সহকারী অধ্যাপক মনিরা পারভীন তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছেন।  

monira

দর্শকদের প্রতিক্রিয়া শুনে বুঝতে পেরেছিলাম তারা মনোযোগ সহকারে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছেন এবং ভিন্নধর্মী এই পরিবেশনা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। তাই অনুষ্ঠান শেষে তারা মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়েছিল। এতসব সুন্দর পরিবেশনার পেছনে যে মানুষটির দীর্ঘ দিনের শ্রম রয়েছে। তা তাকে একজন অনুকরণীয় মানুষে পরিণত করেছে সবার মাঝে। 

লেখক: মো. শাহিন রেজা, সাবেক শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এনএম