শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ডিম ছাড়া পৃথিবী, পুষ্টি থেকে অর্থনীতিতে কত বড় ধাক্কা?

কৃষিবিদ সাকিব ইফতেখার ইসলাম (স্বচ্ছ)
প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

ডিম ছাড়া পৃথিবী, পুষ্টি থেকে অর্থনীতিতে কত বড় ধাক্কা?
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিশ্ব ডিম দিবস। পুষ্টিগুণে ভরপুর ও সহজলভ্য এই খাদ্যটির গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে দিনটি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার পরিচিত ডিম যদি হঠাৎ পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়, তাহলে কী ঘটবে?

কল্পনা করুন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন রান্নাঘরে একটি ডিমও নেই। বাজারেও মিলছে না। হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে উধাও অমলেট, ডিমভাজি কিংবা ডিমের তরকারি। বেকারিতে তৈরি হচ্ছে না পরিচিত অনেক কেক-পেস্ট্রি। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এই একটি খাদ্যের অনুপস্থিতি মানুষের পুষ্টি, খাদ্যাভ্যাস, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বজুড়ে ডিমের রাজত্ব

ডিম পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত প্রাণিজ খাদ্যগুলোর একটি। বাংলাদেশের সাধারণ পরিবারের সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে চীনের ফ্রাইড রাইস, জাপানের তামাগোয়াকি কিংবা ইউরোপের বেকারি শিল্প, সর্বত্র রয়েছে ডিমের উপস্থিতি।

বিশ্বে ডিম উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশ চীন। ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রও উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন করে। অন্যদিকে মেক্সিকোসহ লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে মাথাপিছু ডিম গ্রহণের হার অত্যন্ত বেশি। সহজলভ্যতা, রান্নার বৈচিত্র্য এবং তুলনামূলক কম খরচে পুষ্টি পাওয়ার সুযোগই ডিমকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করেছে।

 

ডিম কেন সুপারফুড?

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের কাছে ডিম একটি পুষ্টিঘন খাদ্য। একটি বড় মুরগির ডিমে সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ ক্যালরি শক্তি এবং প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন পাওয়া যায়। এতে রয়েছে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড।

ডিমের সাদা অংশ মূলত প্রোটিনসমৃদ্ধ। অন্যদিকে কুসুমে রয়েছে স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন এ, ডি, ই, বি১২, কোলিন, সেলেনিয়াম এবং লিউটিন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

প্রোটিন শরীরের পেশি গঠন, ক্ষয়পূরণ এবং কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। ভিটামিন ‘এ’ দৃষ্টিশক্তি ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন ‘ডি’ ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।

মস্তিষ্ক, চোখ ও শিশুর বিকাশে ডিম

ডিমের অন্যতম মূল্যবান পুষ্টি উপাদান কোলিন। এটি মস্তিষ্কের কার্যক্রম, স্নায়ুতন্ত্র এবং কোষের ঝিল্লি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে কোলিন প্রয়োজন।

ডিমের কুসুমে থাকা লিউটিন ও জিয়াজ্যানথিন চোখের রেটিনার জন্য উপকারী। বয়সজনিত চোখের কিছু সমস্যার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও এসব উপাদানের সম্ভাব্য ভূমিকা রয়েছে।

শিশু-কিশোরদের শারীরিক বৃদ্ধি, পেশি গঠন এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে ডিম কার্যকর খাদ্য হতে পারে। তবে শুধু ডিম নয়, সুষম খাদ্যাভ্যাসই সুস্থ বিকাশের প্রধান ভিত্তি।

কোলেস্টেরল নিয়ে ভয় কতটা যৌক্তিক?

ডিম নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত বিতর্ক কোলেস্টেরলকে ঘিরে। একটি বড় ডিমের কুসুমে প্রায় ১৮৫ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। একসময় মনে করা হতো, ডিম খেলেই রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে আধুনিক গবেষণায় বিষয়টি আরও জটিল বলে উঠে এসেছে। অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত ডিম গ্রহণ সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়, এমন শক্তিশালী কোনো  প্রমাণ নেই। বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, সম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ, শরীরচর্চা ও জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।

তবে যাদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি, পারিবারিক উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা কিংবা হৃদরোগের বিশেষ ঝুঁকি রয়েছে; তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী ডিম গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।

ওজন নিয়ন্ত্রণ ও পেশি গঠনে ভূমিকা

ডিমের উচ্চমানের প্রোটিন দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে। সকালের নাস্তায় ডিম রাখলে অনেকের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। তবে শুধু ডিম খেলেই ওজন কমবে, এমন ধারণা সঠিক নয়।

অন্যদিকে নিয়মিত ব্যায়ামকারী ও ক্রীড়াবিদদের পেশির পুনর্গঠন এবং প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ডিম কার্যকর। তুলনামূলক কম খরচে সহজে রান্না করা যায় বলে এটি জনপ্রিয় প্রোটিনের উৎস।

বাংলাদেশের পুষ্টি ও অর্থনীতিতে ডিম

বাংলাদেশে ডিম শুধু খাদ্য নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানসমূহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পোলট্রি খামার, বাচ্চা উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন এবং বিপণনের সঙ্গে অসংখ্য মানুষের জীবিকা জড়িত।

কিন্তু খাদ্য ও ওষুধের ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ, রোগবালাই এবং বাজারদরের অস্থিরতা খামারিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দাম পান প্রান্তিক খামারিরা, অথচ ভোক্তাকে বেশি দামে ডিম কিনতে হয়।

২০২২ সালে দেশে ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। বাজারে প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণ ও কারসাজির অভিযোগও সামনে আসে। তাই ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা জরুরি।

ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা

পুষ্টিকর হলেও ডিম নিরাপদভাবে সংরক্ষণ ও রান্না করা প্রয়োজন। কাঁচা কিংবা অপর্যাপ্ত সিদ্ধ ডিমে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ভালোভাবে রান্না করা ডিম খাওয়া উচিত।

ডিমে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী গ্রহণের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

ছোট্ট ডিমে বড় সম্ভাবনা

একটি ডিম দেখতে ছোট, কিন্তু এর পুষ্টিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশাল। এটি যেমন শিশুর বেড়ে ওঠার সহায়ক, তেমনি শ্রমজীবী মানুষের জন্য সহজলভ্য প্রোটিনের উৎস এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন।

ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি, খামারিদের সুরক্ষা, বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডিম কেবল সকালের নাস্তার একটি উপাদান নয়, এটি পুষ্টি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক অসাধারণ প্রতীক। প্রকৃতির এই ছোট্ট উপহারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে সুস্থ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি কার্যকর পদক্ষেপ।

লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

এফএ/

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর