‘একা জীবনে বন্ধুত্বের রংধনু হয়ে এসেছিল ইরা’

অধরা আঞ্জুমান পৃথা
প্রকাশিত: ০৭ আগস্ট ২০২২, ১২:৪০ পিএম
‘একা জীবনে বন্ধুত্বের রংধনু হয়ে এসেছিল ইরা’

আমি একা একজন মানুষ। কেমন একা তা উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হতে পারে। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন কারো সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নেই। বাবা-মা চাইতেন না আমি ম্যাট্রিক দেয়ার পর বিয়ে না করে পড়াশোনা করি। ভাই-বোন চাইতেন না আমি সাহিত্য জগতে আসি। এই যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল, তা মজবুত থেকে আরও মজবুত হতে থাকলো। দিন দিন একটা বিশাল একাকিত্বের জগতকে ঘিরে আমার দুনিয়া শুরু হলো। 

এমন সময়ে ইরা আমার জীবনে এলো বন্ধু হয়ে। আমার জগত ভরে উঠল আলোতে। মন খারাপ হলেই ‘এই আয় তো আমার হাত ধর। আজ আমরা সারা শহর চষে বেড়াবো।’ লাইন দিয়ে সব ভুলিয়ে দিত। কখনো টেরই পেতাম না আমি বিষণ্ণ, আমি ভাঙা, আমি একা। একা জীবনে বন্ধুত্বের রংধনু হয়ে এসেছিল ইরা। আমি হয়ে গেলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

priঅন্যের জীবনে সুখের বৃষ্টি হয়ে আসা মানুষেরা নিজেদের কষ্ট আড়াল করে রাখে। হঠাৎ ইরার মা অসুস্থ। রক্ত কিনতে টাকা লাগে। ইরা সেই টাকা জোগাড় করতে পারে না। আমি দেখতাম হাসপাতাল থেকে ফোন এলেই ইরা কিছুসময়ের জন্যে এলোমেলো হয়ে যেত। ফোন হাতে নিয়ে বাইরে চলে যেত। আমার কিছু করার ছিল না। ইরাকে এই অবস্থায় কী বলা যায় আমি খুঁজে পেতাম না। বিকাশ দোকান থেকে অচেনা নম্বর হয়ে মাঝে মাঝে টাকা পাঠাতাম। আমরা যে কজন ওর প্রিয় ছিলাম, সবাই মিলে টাকা তুলতাম। ইরা টের পেতো না। ওর মায়ের সুস্থতা ওর কাছে যত দামি, ইরার হাসি আমাদের কাছে তার চেয়ে দামি ছিল। 

থেমে না থাকা সময়ের সঙ্গে ভেসে ভেসে আজ আমরা অনেকটুকু এসে গেছি। ইরা ভাল চাকরি পেয়েছে। বন্ধুরা অনেকে দেশের বাইরে চলে গেছে। আমি মাসে একটা দুটো গল্প ছাপি। ভাল হলে টাকা পাই। না হলে পাই না। 

priএকদিন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। আগস্ট মাস। ‘গল্প ভাল না হলে টাকা পাই না’ এমনই একটা মাস। অভাব চলছে। অভাবকে আমার শিল্পের মতো মনে হয়। একদিন টাকা ছিল। এখন টাকা নেই তবে শিল্প আছে। সেই শিল্পের নাম অভাব। আমি জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছি ‘কিছুতে কেন যে মন লাগে না। ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে…’

এমন সময় ফোনে মেসেজ আসার শব্দ এলো। বিকাশ আমাকে জানাচ্ছে- এক অচেনা নম্বর থেকে আমাকে ২০ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে। সাথে ছোট্ট বার্তা- ‘চুপি চুপি আমাকে টাকা পাঠাতি আম্মুর জন্যে। আমি কখনো জানবো না ভেবেছিস? তোকে ছুঁতে পারি না বহুদিন। এই টাকাটা ছুঁয়ে ভাববি আমি তোর জন্যে আমার স্পর্শ পাঠালাম। তোর ইরা’।

priআজ বন্ধু দিবস, আমার চোখের কোণে আনন্দের জল। আমার একটা ইরা আছে, এই আনন্দ! 

লেখক: কনটেন্ট রাইটার, অ্যামেজ ক্রিয়েটিভ বাংলাদেশ 

এনএম