লিপস্টিক: আভিজাত্য আর কালো অধ্যায় পেরিয়ে সাধারণ নারীর অনুষঙ্গ

ফারদীন হক জ্যোতি
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২২, ১১:২৩ এএম
লিপস্টিক: আভিজাত্য আর কালো অধ্যায় পেরিয়ে সাধারণ নারীর অনুষঙ্গ

নারীদের কাছে লিপস্টিক কেবল একটি মেকআপ সামগ্রী নয় বরং এটি নারীদের কাছে একটা আবেগের নাম। ছোটবেলায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙানোর মতন মধুর স্মৃতি কম বেশি সব কন্যা শিশুরই আছে। আবার বর্তমানে কর্মব্যস্ত জীবনে বহু কর্মজীবী নারী অথবা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীরা নিজেদের সৌন্দর্য চর্চায় বেছে নেন লিপস্টিক। উজ্জ্বল রঙে নিজেদের ঠোঁট রাঙিয়ে ঘরের বাইরে বের হন তারা। 

তবে এই লিপস্টিক কিন্তু সবসময় কেবল নারীদের মেকআপ সামগ্রী হিসেবেই প্রচলিত ছিল না। বরং এক সময় পুরুষও লিপস্টিক ব্যবহার করত। তাই বলা যায় লিপস্টিক নতুন কিছু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুবছরের ইতিহাস ঐতিহ্য। এ কথা সত্য যে আদিকালের লিপস্টিক আর বর্তমানে ব্যবহৃত লিপস্টিকের ফরমুলাতে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। পুরানো দিনের লিপস্টিকের বিপরীতে আধুনিক কালের লিপস্টিকগুলো আপনার ঠোঁটকে আরও বেশি সুন্দর ও হাইড্রেট করতে পারে। তাহলে চলুন জেনে আসি লিপস্টিকের বহু শতাব্দীর কিছু ইতিহাস- 

lipstickপ্রাচীন কালে লিপস্টিক

প্রাচীন যুগে নিজের স্ট্যাটাস বা আভিজাত্য বোঝানোর জন্য নারী ও পুরুষ উভয়ই মেকআপ করতেন। এই মেকআপের একটি অংশ ছিল গাঢ় রঙে ঠোঁট রাঙানো। তবে এ সময় কেবল চেহারার নান্দনিকতা রক্ষার জন্য নয় বরং সুরক্ষার জন্য এবং ওষুধি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হতো লিপস্টিক যা কিনা ঠোঁটকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করতো। 

লিপস্টিকের উপাদান পতঙ্গ, সীসা

তখন লিপস্টিক ঠোঁটে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য আঠার সঙ্গে জাম জাতীয় ফল, লাল সীসা, পোড়া মাটি, মেহেদি, বিভিন্ন পোকা মাকড়, গাছ-গাছড়ার ছাল লতা কিংবা খনিজ উপাদানের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে এক্ষেত্রে মেসোপটেমিয়ার মহিলারা একটু এগিয়ে ছিলেন। তারা তাদের ঠোঁটে রঙ করার জন্য কোসিনিয়াল নামের একধরনের পরজীবী পতঙ্গ এবং রঙকে আরও উজ্জ্বল ঝলমলে করতে মাটির মূল্যবান গহনার ব্যবহার শুরু করেছিলেন।

এসময় বেগুনি ও কালোর মতো গাঢ় শেডগুলি জনপ্রিয় ছিল। তারা এই রঙগুলো কারমাইন ডাই থেকে তৈরি করতো যা গ্রাউন্ডেড কোচিনিয়াল পোকা থেকে প্রাপ্ত। আসলে, কারমাইন ডাই বর্তমানেও লিপস্টিক এবং অন্যান্য মেকআপ পণ্যগুলিতে ব্যবহৃত হয়। তবে মিশরীয়রা লিপস্টিককে আরও উন্নত করার জন্য এর সঙ্গে সীসাসহ মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার শুরু করেছিল। যার ফলে মানুষের মারাত্মক রোগসহ মৃত্যু পর্যন্ত হওয়ার আশঙ্কা লক্ষ‍্য করা যায়। 

lipstickঅপরদিকে জাপানে মহিলারা মোম ও আলকাতরা ব্যবহার শুরু করে লিপস্টিকের নতুন মাত্রা যুক্ত করেন। এসব ধারণাকে পিছনে ফেলে লিপস্টিককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায় একজন আরব বিজ্ঞানী আবুল কাসিস। তিনি শরীরে মাখার জন্য একটি সুগন্ধি উপাদান আবিষ্কার করেন, যা পরে ছাঁচে ফেলা যাবে। পরবর্তীতে তিনি এর সঙ্গে রং দিয়ে একই পদ্ধতিতে চেষ্টা করে সলিড লিপস্টিক আবিষ্কার করেছিলেন এবং সেখান থেকেই শুরু হয় সলিড লিপস্টিক এর সূচনা লগ্ন। 

পতিতাবৃত্তির ইতিহাসে লিপস্টিক ও মধ্যযুগ

মধ্যযুগে সাধারণত গ্রিসে লিপস্টিক ব্যবহার করতো যৌনকর্মীরা। তখন একটি আইনও করা হয়েছিলো যে যৌনকর্মীরা অবশ্যই কালো বা লাল রঙের লিপস্টিক পরিধান করবে। এখানেই শেষ নয়। যৌনকর্মী হয়েও যদি কেউ লিপস্টিক না পরত তাহলে তাকে মুখোমুখিও হতে হতো কঠিন বিচারের। মধ্যযুগের যে সময়ে খ্রিস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কাজ অধিক গুরুত্বের সঙ্গে শুরু হয়, তখন লিপস্টিক পরাকে আবারও প্রশ্নবিদ্ধ করে ধর্ম যাজকেরা। সেসময় লিপস্টিক দেওয়া লাল ঠোঁটকে শয়তানের উপাসনার সঙ্গে তুলনা করা হয়। 

lipstickএই সময় লিপস্টিক ব্যবহার করা মহিলাদের যাদুকর এবং ডাইনি বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। কটাক্ষ করে বলা হতো পতিতা ছাড়া, কোন স্বসম্মানী মহিলারা রঙিন ঠোঁট করে না। তবে পরবর্তীতে পোপ বা ধর্ম যাজকেরা একটি নির্দেশনা প্রচলন করলেন। এর ফলে লিপস্টিক পুরোপুরি বন্ধ হয়নি কিন্তু লাল বা গাঢ় রঙের পরিবর্তে ব্যবহারে অনুমতি দেওয়া হয় প্রাকৃতিক গোলাপি রঙ। এটি তখনকার নারীদের পাপশূন্যতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল। 

কালো অধ্যায় হলো রঙিন

ষোড়শ শতাব্দীতে রানী প্রথম এলিজাবেথের হাত ধরে লিপস্টিকের কিছুটা হাল বদল ঘটে। তিনি সাধারণত উজ্জ্বল গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিক ব্যবহার করতে পছন্দ করতেন। তবে এই সময়েও সর্ব সাধারণের জন্য লিপস্টিক ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তখন কেবল উচ্চ শ্রেণির মহীয়সী নারী বা মঞ্চ অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের মধ্যে এটি ব্যবহারের চল লক্ষ‍্য করা যায়। 

lipstickলিপস্টিকের বাণিজ্যিক যাত্রা

১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে একটি ফরাসি সুগন্ধি কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে প্রথম লিপস্টিক উৎপাদন করা শুরু করে। এই লিপস্টিক উৎপাদনে ব্যবহার করা হতো মাছের আঁশ, মোম এবং ক্যাস্টর অয়েল যা পরে একটি সিল্ক কাগজে মোড়ানো হয়েছিল। এরপর সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ১৯১৫ সালে লিপস্টিককে নলাকার পাত্রে রূপ দেন মরিস লেভি। এসময় নারী ও পুরুষ উভয়ই খুব গাঢ় করে লিপস্টিকে ঠোঁট আবৃত করে রাখতেন। এমনকি তখনকার দাড়ি গোঁফওয়ালা পুরুষেরাও তাদের গোঁফে আবৃত ঠোঁটের নিচে লিপস্টিক পরতে একদম দ্বিধা বোধ করতেন না। 

lipstickনারী বিদ্রোহের প্রতীক 

অতীতে যেসব কুসংস্কার প্রচলিত ছিল লিপস্টিক নিয়ে তা উনবিংশ শতাব্দীতে আস্তে আস্তে কাটতে থাকে। এই সময়ে এসে ইউরোপ এবং আমেরিকা জুড়ে লিপস্টিক বিক্রি এবং এর প্রচার প্রসারের জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়াও শুরু হয়। তখন এসব লিপস্টিক কাগজের কৌটায় বা টিউবে বিক্রি করা হতো। তাছাড়াও এই শতকে নারীরা তাদের অধিকার ও সৌন্দর্য সচেতনতা নিয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠে, বলা হয় এই যুগেই নারীবাদেরও উৎপত্তি ঘটে। তারা ভাবতে শুরু করলেন, তারা কী পরবেন বা কী করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তাদের নিজেদের। এর ফলে দেখা যায় লিপস্টিকের ব্যবহার নারী বিদ্রোহের এক অসাধারণ প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এমন করেই এই শতকের শেষের দিকে এটি সর্ব সাধারণের জন্য একটি জনপ্রিয় প্রসাধনীতে পরিণত হয়।

lipstickআধুনিক যুগে লিপস্টিক

বর্তমানে লিপস্টিকের ধরন রকম বা রঙে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বিভিন্ন সেডের ও ব্রান্ডের লিপস্টিক পাওয়া যায় এখন। এই যুগেই ঠোঁটের গ্লস, লিপস্টিকের বিভিন্ন রঙ এবং সূত্রের আবিষ্কার হয়েছে। অন্তত সত্য বলতে গেলে মনের মতো রঙের লিপস্টিক হাতের নাগালে পাওয়া কষ্টসাধ্য কিছু নয়। একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহিলারা তাদের জীবদ্দশায় লিপস্টিকের জন্য গড়ে $3500 ডলারের বেশি ব্যয় করে থাকেন। বর্তমানে হালকা থেকে গাঢ় বা বিভিন্ন উজ্জ্বল রঙের লিপস্টিক আধুনিক নারীদের আত্ম-প্রকাশের প্রতীক হয়ে উঠেছে।  

lipstickবেশিরভাগ নারীর পছন্দের মেকআপ পণ্য লিপস্টিকের ইতিহাস জেনে নিশ্চয় আপনি অবাক হচ্ছেন। আপনার ড্রেসিং টেবিলে বা ব্যাগে থাকা ছোট লিপস্টিকের জীবনযাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। বহু ধাপ পেরিয়ে নারীদের সৌন্দর্য চর্চার এক বড় অংশ দখল করে আছে বর্তমানে উচ্চমানের আধুনিক কেমিক্যাল ফর্মুলায় তৈরি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামীদামী লিপস্টিক। যা নারীদের আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।

লেখক পরিচয়: ফিচার লেখক

এনএম