আধুনিকার ছোঁয়ায় সমাজ বদলাচ্ছে, সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের চিন্তাভাবনাও। তবুও আমাদের চারপাশে বা অনেক সময় নিজেদের অজান্তেই এমন কিছু মনোভাব ও আচরণ রয়ে যায়, যা নারীবিদ্বেষ বা মিসোজিনির পর্যায়ে পড়ে। অনেক সময় সাধারণ অপছন্দ বা মতের অমিলকে অনেকে নারীবিদ্বেষ বলে ভুল করেন। কিন্তু মিসোজিনি এর চেয়ে অনেক বেশি গভীর।
মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষ আসলে কী?
মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষ হলো এমন একজন ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা, যিনি নারীদের প্রতি ঘৃণা, বিদ্বেষ, অবিশ্বাস বা গভীর পূর্বসংস্কার পোষণ করেন। সাধারণ অপছন্দ বা মতের অমিল এখানে মূল বিষয় নয়, বরং নারীদের ছোট করা, অবমূল্যায়ন করার মানসিকতা এবং তাদের ওপর পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য বজায় রাখার জেদই হলো নারীবিদ্বেষ।

কেন এমন হয় এবং লক্ষণগুলো কী?
কোনো নির্দিষ্ট মেয়েকে বা সাধারণভাবে নারীদের পছন্দ না করার পেছনে নানা সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করতে পারে। তবে একজন মানুষের আচরণে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ প্রকাশ পেলে তাকে মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। নিচে এমন প্রধান লক্ষণগুলো এই প্রতিবেদনের আলোচনা করা হলো-
নারীদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া: নারীদের কথা বলার সময় বারবার বাধা দেওয়া, তাদের বুদ্ধিমত্তা বা চিন্তাভাবনাকে খাটো করে দেখা এবং যেকোনো আলোচনায় তাদের মতামতের কোনো মূল্য না দেওয়া নারীবিদ্বেষের অন্যতম প্রধান লক্ষণ।
ভোগের বস্তু হিসেবে দেখা: নারীদের একজন স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সম্মান না করে, কেবল তাদের বাহ্যিক রূপ বা বস্তুগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করা। তাদের মেধা ও ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে শুধুমাত্র ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা এতে কাজ করে।
কম যোগ্য বা দুর্বল মনে করা: কর্মক্ষেত্রে বা সমাজে নারীদের পুরুষদের তুলনায় মানসিকভাবে দুর্বল, কম দক্ষ বা অযোগ্য মনে করা। তারা কোনো বড় দায়িত্ব পেলে তা সফলভাবে করতে পারবে না, এমন ধারণা পোষণ করাও এই মানসিকতার অংশ।
স্বাধীন জীবনযাত্রাকে মেনে নিতে না পারা: নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা, নিজের ক্যারিয়ার গড়া কিংবা নিজেদের শর্তে বেঁচে থাকার অধিকারকে সহজে মেনে নিতে না পারা। নারীরা একটু স্বাধীনচেতা হলেই তাদের আচরণ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করার প্রবণতা দেখা যায়।
সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হওয়া: কোনো নারী কর্মক্ষেত্রে বা ব্যক্তিগত জীবনে সফল হলে তা সহজে মেনে নিতে না পেরে তার অর্জনকে খাটো করার চেষ্টা করা বা তার সাফল্যের পেছনে অন্য কোনো ভুল কারণ খোঁজা।
আরও পড়ুন: সম্পর্কে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ মানে কী? যে লক্ষণগুলো দেখলে এখনই সতর্ক হবেন
সহানুভূতির অভাব: নারীদের আবেগ, কষ্ট বা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে উল্টো তাদের অনুভূতিগুলোকে 'অতিরঞ্জিত' বা 'নাটকিয়তা' বলে উড়িয়ে দেওয়া।
সব দোষ নারীদের ঘাড়ে চাপানো: যেকোনো সামাজিক সমস্যা বা সম্পর্কের অবনতিতে একপক্ষীয়ভাবে নারীদেরই দায়ী করার মানসিকতা এবং পুরুষতান্ত্রিক অবস্থান থেকে সবসময় নিজেদের সঠিক মনে করা।
সমান অধিকারের বিরোধিতা: সমাজ বা পরিবারে নারীদের সম অধিকার ও সমান সুযোগ পাওয়ার বিষয়টিকে মেনে নিতে না পারা এবং পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে চিরস্থায়ী করার পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
নিজের বা আশপাশের মানুষের মধ্যে এই ধরনের মানসিকতা রয়েছে কি না, তা অনুধাবন করা জরুরি। আত্মশুদ্ধি এবং সচেতনতার মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুস্থ ও সমতার সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
এজেড




