বর্ষা প্রায় শেষের দিকে। দেশের প্রকৃতি বর্ষার ছোঁয়ায় নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে নতুন করে। যেন মাত্রই জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। বৃষ্টির পানিতে ধুয়েমুছে যেন চারিদিকে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে তার সতেজতা। কিন্তু শহরের জলাবদ্ধতা আর যানজট আপনাকে বর্ষা উদযাপনই করতে দেয়নি। স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা গরমে জীবন হয়ে উঠেছে অতিষ্ঠ। তাই আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বেরিয়ে পড়ুন বর্ষার সতেজতায় নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে তুলতে। কিন্তু এত অল্প সময়ে ঠিক করে উঠতে পারছেন না কোথায় যাবেন? তবে বেছে নিতে পারেন বাছাই করা এই সেরা ৫ টুরিস্ট স্পটের একটি। কিংবা এই বর্ষায় সবগুলো থেকেই ঘুরে আসতে পারেন। আশা করা যায় নিরাশ হবে না।
টাঙ্গুয়ার হাওর
ভ্রমণপিপাসুদের মাঝে বহুল আকাঙ্ক্ষিত টুরিস্ট স্পটের একটি টাঙ্গুয়ার হাওর। এখানে যেন জলরাশিতে আঁকা প্রকৃতির এক অকৃত্রিম সুর। দেশের উত্তর-পূর্বাংশে সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায় অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। যেখানে জালের মতো ছড়িয়ে আছে দেশের ছোট বড় অসংখ্য খাল-বিল ও নদী-নালা। সাথে যোগ দিয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে আসা ছোট বড় ৩০টি ঝর্ণা। আর এই বর্ষায় সব মিলে মিশে যেন টাঙ্গুয়ার হাওরকে সমুদ্রে রূপ দেয়।
আরও পড়ুন: বর্ষায় পাহাড় ভ্রমণে সতর্কতা
এটি সুন্দরবনের পর দ্বিতীয় রামসা হিসেবে স্বীকৃত। রামসার (Ramsar) হলো আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য স্বাক্ষরিত একটি বৈশ্বিক পরিবেশগত চুক্তি বা কনভেনশন। এই চুক্তির অধীনে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোকে 'রামসার সাইট' (Ramsar Site) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

স্থানীয়দের কাছে এই জায়গা পরিচিত, ‘নয় কুড়ি কান্তার ছয় কুড়ি বিল’। যেদিকে তাকাবেন পানি আর পানি। আর বুক সমান পানিতে যেনো ভেসে থাকে হিজল-করচের বাগান। যা দৃষ্টিনন্দন। এখানে গেলে দেখা মেলতে পারে শাপলা ফুলের। আর মাথার ওপর কখনো স্বচ্ছ পরিষ্কার সুনীল বিশাল আকাশ আবার কখনো মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। নিমিষেই মুষলধারে বৃষ্টি। যে সৌন্দর্যের দেখা মেলে না শহরের জীবনে। আকাশে আরো দেখা মিলবে, চেনা অচেনা, দেশ-বিদেশের নানা প্রজাতির পাখি। যেন প্রকৃতি আহ্বান জানাচ্ছে তার একান্ত কোলাহলে মিশে যেতে।
বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে হাউস বোট। যেগুলোতে করে আপনি যেতে পারেন শিমুল বাগান হয়ে জাদুর কাটা নদীতে। যেখান থেকে খুব কাছ থেকে দেখতে পারবেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সারি বাধা ঢেউ খেলানো পাহাড় ও পাহাড় বয়ে নেমে আসা ঝর্নার জলরাশি।
ঢাকা থেকে যে কোনো বাস কাউন্টার থেকে সহজে চলে যেতে পারবেন সুনামগঞ্জ টাঙ্গুয়ার হাওরে।

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট
দেশের একমাত্র স্বীকৃত সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলাবন। এই বর্ষায় রাতারগুল বন হতে পারে আপনার জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। সিলেট শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায় এর অবস্থান। এর উত্তরে রয়েছে গুয়াইন নদী, দক্ষিণে বিশাল হাওর, আর এই দুয়ের মাঝে রাতারগুল জলাবন। প্রায় ৩০ হাজার ৩২৫ একর জায়গাজুড়ে এর অবস্থান, যার ৫০৪ একর শুধু বন, বাকি এলাকা জুড়ে ছোট বড় জলাশয়ে জীববৈচিত্র্যে পূর্ণ।
বর্ষায় পানি বেড়ে বন আর জলাশয় মিলে মিশে যেন বাংলার আমাজন হয়ে ওঠে। ভরা বর্ষায় হিজল, করচসহ নানা গাছেরা বুক সমান পানিতে ডালপালা ছড়িয়ে যেনো ভেসে বেড়ায়। সেখানে জেলেরা তাদের ছোট ছোট নৌকায় করে ভ্রমণপিপাসুদের নিয়ে যায় জলপূর্ণ, নিস্তব্ধ-রহস্যময় গভীর অরণ্যের দিকে। এসময় দেখা লেলে নানা প্রজাতির পাখিসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীকে আশ্রয় নিতে গাছের ডালগুলোতে।
তবে রাতারগুল বন ভ্রমণে সতর্ক থাকবেন গাছপালাতে আশ্রয় নেয়া বিষধর সাপ থেকে। গাছের ডাল ধরার চেষ্টা করবেন না এসময়।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
এই বর্ষায় যেতে পারেন প্রকৃতির অদেখা অজানা, জাদুতে মোড়ানো দেশের একমাত্র সংরক্ষিত বনাঞ্চল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। যেখানে অতি বৃষ্টির মাঝে বেড়ে ওঠা বনের গাছেরা যেন সূর্যের ছোঁয়া পাওয়ায় প্রতিযোগিতা করে। কে কার থেকে আগে তরতর করে মাথা তুলে দাঁড়াবে সেই চেষ্টায় ব্যস্ত।
সিলেট জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল (আংশিক) উপজেলায় এই বনের অবস্থান। এই বনকে বলতে পারেন প্রকৃতির জাদুঘর। কেননা, এই বনে রয়েছে প্রায় ৪০৬ বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী। বিলুপ্ত প্রায় উল্লুক রয়েছে এখানেই। জুল ভার্নের ৮০ দিনে বিশ্ব ভ্রমণ উপন্যাসের অবলম্বনে মাইকেল অ্যান্ডারসনের ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ চলচ্চিত্রটির বিশেষ কিছু অংশ এখানে চিত্রায়িত হয়েছিল। এই জাদুময়ী বনের সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখার জন্য রয়েছে তিনটি ট্রেইল বা পথ- আধা ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার ভিন্ন ট্রেইলে দলবল নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন। এই বনে গাইড ছাড়া ভুলেও একা যাওয়ার দুঃসাহস করবেন না।

সুন্দরবন
বর্ষা ও সুন্দরবন এই দুয়ের মিলন দিবে আপনাকে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। তাই এই বর্ষায় পছন্দ মতো কোনো এক রিসোর্টে অবস্থান করে সুন্দরবনে ঘুরে আসতে পারেন। গোলপাতার ছাউনিতে বৃষ্টি পড়ার ফোঁটা ফোঁটা শব্দে এক নৈর্সগিক বৃষ্টি বিলাস দেবে আপনাকে।

সমুদ্র
এ সময়কে সমুদ্রের জন্য অফ সিজন বলা হয়। কিন্তু এ সময়ই সবচেয়ে সুন্দর সুযোগ করে দেয় সমুদ্রে আনন্দে মেতে উঠার। বর্ষায় তুলনামূলক মানুষ কম সমুদ্রে যায়। তাই হোটেলগুলো যেমন অনেক ডিসকাউন্ট দেয় তেমনি বিচে মানুষের উপচে পড়া ভিড়ও থাকে কম।
এজেড




