রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সুষমা-কুশল দম্পতির বিচ্ছেদ কেন মানুষ মানতে পারছে না? 

নিশীতা মিতু
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

সুষমা-কুশাল দম্পতির বিচ্ছেদ কেন মানুষ মানতে পারছে না? 
সুষমা-কুশাল দম্পতির বিচ্ছেদ কেন মানুষ মানতে পারছে না

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বর্তমানে হট কেকে পরিণত হয়েছে চিকিৎসক দম্পতি ডা. সুষমা রেজা ও ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশলের বিচ্ছেদের খবর। আর হবে নাই বা কেন? জনপ্রিয় এই দম্পতি চিকিৎসার পাশাপাশি সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নানা উপদেশ প্রদানের জন্যও পরিচিত। প্রায় দুই দশকের দাম্পত্য জীবন কাটানোর পর পারস্পরিক সম্মতিতে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। জানিয়েছেন নিজেরাই। কিন্তু তাদের ঘোষণা যেন কিছুতেই মানতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বিগত কয়েকদিন ধরে এ বিষয় নিয়েই চলছে নানা আলোচনা, সম্পর্ক, বিশ্লেষণ। কারো কারো কাছে তাদের বিচ্ছেদ যেন অস্বাভাবিক ঘটনা। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন— যারা অন্যদের সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জীবন নিয়ে পরামর্শ দেন, তাদের নিজেদের সম্পর্ক কীভাবে ভেঙে যেতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাজের একটি বড় ভুল ধারণা। আমরা প্রায়ই ধরে নিই, যিনি সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন, দাম্পত্য বিষয়ে পরামর্শ দেন কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন, তার নিজের জীবনে বুঝি সব সম্পর্ক নিখুঁত ও সমস্যামুক্ত হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সম্পর্কবিষয়ক জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা কিংবা সচেতনতা কোনোটিই একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সব পরিস্থিতি বা সমস্যা মোকাবিলার নিশ্চয়তা দেয় না। 

sushama

একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞও হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারেন, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞও ভুগতে পারেন মানসিক চাপে। ঠিক তেমনি, সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে বা মানুষকে পরামর্শ দেয় এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কেও দেখা দিতে পারে জটিলতা, দূরত্ব বা মতপার্থক্য। সম্পর্ক একটি জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। দুজন মানুষের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, চাওয়া-পাওয়া এবং জীবনযাত্রা সবকিছুই সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। এগুলোর পরিবর্তন যেকোনো সময় সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। আজ যাদের দেখে ‘হ্যাপি কাপল’ মনে হচ্ছে, বছর ঘুরতেই তারা কোনো কারণে অসুখী হতেই পারেন। 

একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না। সেখানে জমাট হয়ে থাকে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের ঘাটতি, মূল্যবোধের পার্থক্য, ব্যক্তিগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকারের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক চাপ কিংবা পারস্পরিক প্রত্যাশার অমিলের মতো হাজারো কারণ। কার সম্পর্কে কীসের ঘাটতি তা কেবল নির্দিষ্ট ব্যক্তিই জানেন। আর তাই অনেক সময় দুইজন মানুষ একে অপরকে সম্মান করেও বুঝতে পারেন, একসঙ্গে পথ চলা আর সম্ভব হচ্ছে না।

sushama_1

আমাদের সমাজে এখনো বিচ্ছেদকে বাঁকা চোখে দেখা হয়। অনেক সময় ব্যর্থতার পাল্লায় মাপা হয় একসঙ্গে থাকতে না পারাকে। অথচ সব বিচ্ছেদ যুদ্ধ, প্রতারণা বা শত্রুতার ফল নয়। অনেকসময় পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান এবং নিজেদের মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেও বিচ্ছেদ হতে পারে। এমনকি কখনো কখনো একটি অসুখী সম্পর্ক ধরে রাখার চেয়ে সম্মানজনকভাবে আলাদা হয়ে যাওয়া দুই পক্ষের জন্যই ভালো হতে পারে।

আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে সামাজিক আলোচনা বেড়েছে। যদিও প্রতিটি বিচ্ছেদের গল্প আলাদা, তবুও এটি স্পষ্ট যে সম্পর্কের বাস্তবতা নিয়ে এখন খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে। সুষমা-কুশল দম্পতির বিচ্ছেদ যার অন্যতম উদাহরণ। 

shusama

এই বিচ্ছেদ আমাদের আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দেয় যেকোনো সম্পর্কের বাইরের ছবি দেখে তার ভেতরের বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। সামাজিক মাধ্যমে দেখা সুখের মুহূর্ত, পরামর্শ কিংবা অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য একটি সম্পর্কের সম্পূর্ণ গল্প নয়।

সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত অন্যের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করা, বিচ্ছেদকে কেবল ব্যর্থতার চশমায় না দেখা এবং সম্পর্কের জটিলতাকে মানবিকভাবে বোঝার চেষ্টা করা। 

এনএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর