মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

বাবা যেন কেবলই দায়িত্ব পালনের যন্ত্র

মো. সেলিম হাসান দুর্জয়
প্রকাশিত: ২১ জুন ২০২৬, ১২:২০ পিএম

শেয়ার করুন:

বাবা যেন কেবলই দায়িত্ব পালনের যন্ত্র
বাবা যেন কেবলই দায়িত্ব পালনের যন্ত্র

একজন বাবাকে আমরা কীভাবে দেখি? 

একজন মানুষ হিসেবে, নাকি একটি দায়িত্ব বহনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে? বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র একজন বাবার পরিচয়কে মূলত দায়িত্বের মধ্য দিয়েই সংজ্ঞায়িত করে। তাঁর ওপর ন্যস্ত করা হয় উপার্জন, পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, সামাজিক মর্যাদা রক্ষা, বিয়ে-শাদি, এমনকি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়। অর্থাৎ বাবা যেন পরিবারের সদস্য নন, বরং পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি।

কিন্তু এই দায়িত্ব পালনের পথে বাবা নামক মানুষটির নিজের স্বপ্নগুলোর কী হয়?

একজন তরুণেরও তো ছিল লেখক হওয়ার স্বপ্ন, সংগীত চর্চার ইচ্ছা, উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা কিংবা পৃথিবী দেখার বাসনা। বাস্তবতার চাপে এসব স্বপ্ন একসময় ‘অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা’ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। ধীরে ধীরে তিনি শিখে যান নিজের চাওয়া-পাওয়াকে পিছনে সরিয়ে রাখতে। এ এক ধরনের নীরব অসহায়ত্ব, যার কোনো প্রকাশ্য ভাষা নেই। তবু বিস্ময়করভাবে অধিকাংশ বাবা এই ত্যাগকে বোঝা হিসেবে নয়, আনন্দ হিসেবেই গ্রহণ করেন। 

সন্তানের প্রথম বিদ্যালয়ে যাওয়া, পরীক্ষার ফল, চাকরি পাওয়া কিংবা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এসব অর্জনের মধ্যে তাঁরা নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্নের পরোক্ষ বাস্তবায়ন খুঁজে পান। নিজের জন্য কেনা হয়নি যে বই, ঘোরা হয়নি যে শহর, অর্জিত হয়নি যে ডিগ্রি—সন্তানের সাফল্যের মধ্যে তার ক্ষুদ্র প্রতিফলন দেখেই তাঁরা তৃপ্ত হতে শেখেন। পিতৃত্বের এই মনস্তাত্ত্বিক শক্তিই বাবার সবচেয়ে বড় মানবিক মহিমা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যৌবনের শক্তি, সময় ও সম্ভাবনা পরিবারের জন্য উৎসর্গ করার পর একজন বাবা কী পান?

তাঁর বার্ধক্যের জন্য কতটা প্রস্তুত আমাদের পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র? বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা, অবসর সুবিধা বা মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা নেই। ফলে বহু বাবা কর্মক্ষমতা হারানোর পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। অথচ একটি সভ্য সমাজের নৈতিকতার অন্যতম মানদণ্ড হলো সে তার প্রবীণদের কতটা মর্যাদা দেয়। 

যে মানুষটি নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে অন্যদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেছেন, তাঁর জন্য সম্মান, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বলয় নিশ্চিত করা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও অপরিহার্য শর্ত। বাবার ত্যাগকে স্মরণ করা যথেষ্ট নয়, তাঁর বার্ধক্যকে মর্যাদাপূর্ণ করা প্রয়োজন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ; ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর।

এনএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর