মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

অর্জন বা পরামর্শে বাবার শূন্যতা এবং তার আদর্শ

উম্মে সালমা
প্রকাশিত: ২১ জুন ২০২৬, ১১:৫২ এএম

শেয়ার করুন:

অর্জন বা পরামর্শে বাবার শূন্যতা এবং তার আদর্শ
অর্জন বা পরামর্শে বাবার শূন্যতা এবং তার আদর্শ

'বাবা' খুব ছোট একটি শব্দ, কিন্তু তার মর্মার্থ অনেক গভীর। বাবা হলেন একটি সংসারের বটবৃক্ষ। বটবৃক্ষের ছায়ায় পথিকেরা যেমন ক্লান্তি দূর করে, শীতলতা অনুভব করে, ঠিক তেমনি বাবার স্নেহ-ভালোবাসায় সন্তানের জীবনের সব দুর্দশা ও ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। বাবার ভালোবাসা ও নির্দেশনায় সন্তানরা সারাজীবন আলোর পথ খুঁজে পায়। বাবাহীন জীবন বালুকাময়। সেখানে স্বস্তি নেই, শীতলতা নেই। যেদিকে চোখ যায়, দেখা যাবে শুধু হাহাকার আর ধূসর প্রান্তর। একটি মেয়ের কাছে বাবা হলো আস্থা, ভরসা ও নির্ভরতার জায়গা। বাবার ছায়া কত যে বিশাল সেটি বোধহয় কেবল যারা বাবা হারায় তারাই বুঝে। বুকভরা বিষণ্ণতা আজও আমাকে অশ্রুসিক্ত করে।

বাবা নামক স্নেহ-ভালোবাসায় ভরা মানুষটি আজ  অনেক দূরে। বাবাকে কয়েক বছর ধরে হৃদয়ের গভীরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। খুঁজতে খুঁজতে হয়তো আমারই সময় শেষ হয়ে আসবে, তবু আর বাবার হাতের স্পর্শ পাব না। আমার দেখা সাধারণের মধ্যে  অসাধারণ মানুষদের একজন আমার আদর্শবান বাবা। সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন যাপন করা সৎ ও কর্মনিষ্ঠ এই মানুষটি আমার জীবনের আদর্শ ছিলেন। সেই গৌরব হারানোর বেদনা পৃথিবীর কোনো কিছুর বিনিময়েই প্রশমিত হওয়ার নয়। এ এক অবর্ণনীয় শূন্যতা, যা কেবল মিশে আছে হৃদয়ের রক্তক্ষরণে। 

বাবা স্বশরীরে বেঁচে নেই, তবু বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে প্রতি মুহূর্তে। আমাদের ভালোর জন্য বাবা জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করেছেন। কখনো নিজেকে ভালো রাখার চিন্তা করেননি। নিজেকে নিয়ে কখনো ভাবেনি, ভেবেছে শুধু সন্তানরা কিভাবে ভালো থাকবে, খুশি থাকবে তা। শত অসুস্থতা, কষ্ট, চিন্তার মাঝেও আমাদের এক চিলতে হাসি দেখে তাঁর কষ্ট, অসুস্থতা এবং চিন্তা নিমিষেই ভুলে যেতো। কখনো বুঝতে দিতো না কোনো কষ্ট। আমরা কিভাবে ভালো থাকবো সেই চিন্তাতে থাকতো সব সময়। 

বাবা শব্দটা মুখে আসতেই মনে আসে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের শব্দ। স্নেহের শীতল ছায়াতলের বটবৃক্ষের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মতো শব্দ। বাবাকে আমরা ভাই-বোনেরা আব্বু ডাকতাম, আমার কাছে মনে হতো এই সম্বোধনটাই বেশি কোমল এবং বেশি কাছের। কিন্তু তার চেয়েও বেশি কোমল আর অধিকতর কাছের ছিল বাবার মুখে  আমাদেরকে আব্বু-আম্মু ডাকটা। নাম ধরে তেমন কখনো ডাকেনি। সব সময় আমাদের আব্বু- আম্মু বলে সম্বোধন করতো যে ডাকটা আজ আমরা মিস করি। কাজের সূত্রে বাবা ছিলেন বাইরের দেশে, এ কারণে বাবার সাথে আমাদের সময়টা কেটেছে কম। কিন্তু যে সময়গুলো বাবার সাথে কাটিয়েছি আমরা ভাই-বোনরা তা অমূল্য এক একটি রত্ন। এই স্মৃতিগুলোই আঁকড়ে বেঁচে থাকা। 

প্রতিটি সন্তানের বুকজুড়ে থাকে বাবার প্রতি চির অম্লান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আমাদের কাছেও ব্যতিক্রম নই। এই ভালোবাসা জগতের সকল কিছুর তুলনার ঊর্ধ্বে। বাবার মৃত্যুর পর থেকে যখন কোনো বিপদে দিশাহারা হয়ে পড়ি, অভিভাবকহীনতার কষ্টে ভুগি, কারো পরামর্শ চাইলে শুনতে হয়, তুমি এখন বড় হয়েছ, নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে শিখো। 

বাবা থাকতে কখনো মনে হয়নি আমি বড় হয়েছি, মনে হতো ছোট আছি। আর এখন মনে হয় বয়স হয়েছে বুঝার, ছোট কিংবা বড় বড় সিদ্ধান্ত নিজেরই নিতে হবে। বাবা হারানোর ব্যথা বা বাবার শূন্যতা ভয়ানক।  বাবার শূন্যতা এমন এক গভীর অনুভূতি যা প্রতিটি অর্জনে বা সাফল্যের মুহূর্তে তীব্রভাবে ধরা দেয়। যে বাবা হারায়নি, সে এই ব্যথা কখনোই বুঝবে না। তাদের কাছে এই ব্যথা নিছক একখানা গল্প মাত্র।

সন্তানের প্রতিটি ছোট-বড় অর্জনের পেছনে একজন বাবার অবদান থাকে অসীম। যখন জীবনে নতুন কোনো ধাপ পেরোনো হয়, তখন মনের অজান্তেই চোখ খোঁজে সেই পরিচিত মুখটি। সেই মুহূর্তে বাবার শূন্যতা মনে করিয়ে দেয়। অশ্রুসিক্ত নয়নে চোখ ভিজে একাকার হয়ে ওঠে, মন ব্যাকুল করে। কোনো ছোট-বড় সাফল্য আসে, কিন্তু সেই সাফল্যের উৎসবে বাবার দেওয়া সেই গর্বিত হাসি, এভাবে এগিয়ে যাও মা এই স্নেহের অভাব সবকিছুকে ফিকে করে দেয়। 

যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বাবার সেই অভিজ্ঞ মতামত ও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব গভীরভাবে অনুভূত হয়। বাবার শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও, তাঁর দেওয়া শিক্ষা ও আদর্শ বেঁচে থাকে সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপে। এই শূন্যতা ধীরে ধীরে এক অসীম শক্তিতে পরিণত হয়। বাবার রেখে যাওয়া মূল্যবোধ ও উপদেশগুলো তখন জীবনের চলার পথে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে। স্মৃতিগুলোই হয়ে উঠে অনন্য অনুপ্রেরণার অংশ হিসেবে। বাবার দেখানো পথে হেঁটে তাঁর বলা প্রতিটি কথা, তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো পূরণ করার তাগিদ থেকেই সন্তান খুঁজে পায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তি। এ শক্তি প্রতিনিয়ত সন্তানকে একটি নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী করে নেয়। 

বাবার অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন হলেও, প্রতিটি অর্জনের মাধ্যমে তাঁর স্মৃতি ও শিক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখাই সন্তানের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ

এনএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর