সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঘুমানোর অদ্ভুত এক শান্তি আছে। ছোট্ট শরীরটা যখন আপনার বুকের ওমের সাথে মিশে থাকে, মনে হয় পৃথিবীর সব স্বস্তি বুঝি এখানেই। কিন্তু ঠিক তখনই হয়তো আশপাশ থেকে কেউ বলে ওঠেন, সারাক্ষণ কোলে নিয়ে শুইয়ে থেকো না, অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। বাচ্চাকে একা ঘুমাতে শেখাও।
নতুন মায়েদের এই কথাটি শুনতে হয় প্রায়ই। শোনার পর মনের ভেতর একটা খচখচে অনুভূতি তৈরি হয়। আমি কি তবে সত্যিই আদরের নামে বাচ্চার ক্ষতি করছি? ওকে কি এখনই একা ঘুমাতে শেখানো উচিত?
বিজ্ঞাপন

আপনার মনের এই দ্বিধা দূর করতে পারে বিজ্ঞানের একটি চমৎকার পরীক্ষা। কেপটাউন ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নিলস বার্গম্যান একবার ভাবলেন, মায়ের বুকে আর একা দোলনায় ঘুমানোর সময় নবজাতকের মস্তিষ্কে আসলে কী ঘটে, তা তিনি সরাসরি দেখবেন। মাত্র দুই দিন বয়সী কিছু শিশুর ওপর তিনি এই নিরীক্ষা চালান। ব্রেইন স্ক্যান এবং হৃদস্পন্দন মাপার মেশিনের মাধ্যমে তিনি যে ফলাফল পেলেন, তা প্রচলিত সব ধারণাকে রীতিমতো চমকে দিল।
বিজ্ঞানীরা দেখলেন, শিশুটি যখন মায়ের বুকের সাথে একেবারে লেপ্টে ঘুমায়, তখন তার শরীর এক জাদুকরী প্রশান্তি অনুভব করে। মায়ের গায়ের চেনা গন্ধ আর বুকের ধুকপুকানিতে তার হৃদস্পন্দনের গতি শান্ত হয়ে আসে। শ্বাসপ্রশ্বাস হয় অনেক বেশি গভীর ও স্বাভাবিক। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, শিশুর মস্তিষ্ক তখন এক বিশেষ ধরনের নিরাপদ ছন্দে কাজ করে। নিরবচ্ছিন্ন আর গভীর ঘুমের জন্য মস্তিষ্কের এই শান্ত অবস্থাটি শিশুর খুব দরকার।

বিজ্ঞাপন
কিন্তু ঠিক তার উল্টো ঘটল যখন সেই একই শিশুকে মায়ের কোল থেকে নামিয়ে একা একটি আরামদায়ক দোলনায় শুইয়ে দেওয়া হলো।
মেশিনের পর্দায় বিজ্ঞানীরা দেখলেন, একা থাকা অবস্থায় শিশুটির মস্তিষ্ক ভীষণ সতর্ক আর অস্থির হয়ে উঠেছে। বাইরে থেকে দেখতে তাকে চুপচাপ ঘুমন্ত মনে হলেও, ভেতরে তার মস্তিষ্ক চরম আতঙ্কে ভুগছিল। হাজার বছর ধরে মানুষের বিবর্তনে শিশুরা এভাবেই বড় হয়েছে। একা থাকা মানেই তাদের অবচেতন মনের কাছে বিপদের হাতছানি। তাই একা শুলে তাদের মস্তিষ্ক সতর্ক পাহারায় চলে যায়।

চিকিৎসকদের ভাষায় এটি হলো টিকে থাকার লড়াই। এই মানসিক চাপের কারণে শিশুটি কিছুতেই সেই আরামদায়ক গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে পারছিল না। মস্তিষ্কের স্ক্যানে দেখা গেল, একা ঘুমানোর কারণে শিশুর গভীর ঘুম প্রায় ৮৬ শতাংশ কমে গেছে।
তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? বাজারে শিশুদের শান্ত রাখার জন্য যতই দামি কম্বল বা ডিভাইস পাওয়া যাক না কেন, মায়ের বুকের সেই ওমের কোনো বিকল্প নেই। মাতৃগর্ভে থাকার সময় থেকেই মায়ের হৃদস্পন্দন সন্তানের কাছে সবচেয়ে পরিচিত। মা-ই সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

তাই কোল ঘেঁষে শিশুর নিশ্চিন্তে ঘুমানো কোনো বাজে অভ্যাস নয়। মায়ের কাছে থেকেই সন্তানের মস্তিষ্ক প্রতিদিন শিখছে, নিরাপদ ঘুম আসলে কেমন হয়। এটি কোনো শৌখিনতা নয়, এটি পুরোপুরি বিশুদ্ধ জীববিজ্ঞান। শৈশবের এই সময়টায় শিশু যখন মায়ের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ভাববে, এই মানসিক ভিত্তিটাই তাকে ভবিষ্যতে একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হতে সাহায্য করবে।
তাই চারপাশের কথায় বিভ্রান্ত হবেন না। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রাখার এই সময়টুকু খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়। তাই দ্বিধা ভুলে এই অমূল্য সময়টুকু মন ভরে উপভোগ করুন।
লেখক: শিক্ষার্থী, শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, ঢাকা।
এনএম




