মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ঢাকা

আজ বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

সুইয়ের ভয় জয় করে ১৫ বার রক্তদান

লাইফস্টাইল প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২৬, ০১:১৭ পিএম

শেয়ার করুন:

সুইয়ের ভয় জয় করে ১৫ বার রক্তদান
মিজানুর রহমান এ পর্যন্ত ১৫ বার স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়েছেন এবং ১৬তম বারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

রক্তদানকে বলা হয় জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। আমাদের চারপাশে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা নীরবে-নিভৃতে এই উপহারটি বিলিয়ে যান অন্যের জীবন বাঁচাতে। রক্তদান কেবল একটি মানবিক সেবা নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। এই মহৎ কাজে যুক্ত হয়ে অনেকেই তৈরি করেন নিজেদের জীবনের কিছু স্মরণীয় গল্প। তেমনই এক প্রেরণাদায়ক ও চমৎকার গল্প নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মিজানুর রহমানের। রক্তদানের প্রতি তার যেমন রয়েছে তীব্র ব্যাকুলতা, তেমনি তার প্রথমবার রক্ত দেওয়ার অভিজ্ঞতাটি ছিল বেশ নাটকীয় ও হাস্যরসে ভরপুর।

সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপে যখনই ঘোষণা আসে একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে এ পজিটিভ রক্তের প্রয়োজন'। তখনই চঞ্চল হয়ে ওঠেন মিজানুর। কোনো কল বা মেসেজ পেলেই নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেন না। মনে হয়, কখন ছুটে যাবেন আর কখন রক্ত দিয়ে একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। 


বিজ্ঞাপন


তবে কখনো কখনো পরিস্থিতি ভিন্ন হয়। নিজের রক্ত দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ তিন মাস পূর্ণ হওয়ার আগে যদি এমন কোনো অনুরোধ আসে, তখন মিজানুরের মন কষ্টে ভরে ওঠে। নিজের কাছে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। তিনি ভাবেন, কেন তিন মাস পর পর রক্ত দেওয়ার নিয়ম হলো? কেন মন চাইলেই যখন তখন রক্ত দেওয়া যায় না? অনেক সময় অন্য কারো কাছ থেকে রক্তের ব্যবস্থা করতে না পারলে নিজের ওপর এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি হয়। মিজানের মতে, রক্তদান এমন একটি মহৎ কাজ যা সবাই চাইলেই করতে পারে না, এর জন্য তীব্র ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হয়।

blood1

মিজানুর রহমান এ পর্যন্ত ১৫ বার স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়েছেন এবং ১৬তম বারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে তার প্রথম রক্তদানের দিনটি জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে রয়ে গেছে। সেদিন ঢাকার কাকরাইল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে রক্ত দিতে গিয়েছিলেন তিনি। একা একা ভয় লাগছিল বলে সঙ্গে নিয়েছিলেন পরম বন্ধু রিজওয়ানকে। হাসপাতালের সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে যখন রক্ত নেওয়ার বেডে শুলেন, তখনই শুরু হলো মূল ভয়। রক্ত নেওয়ার বড় সুইটি দেখেই মিজানের বুকে কাঁপন ধরে গেল। সেই মুহূর্তে বন্ধু রিজওয়ানকে ভেতরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। রক্ত নেওয়ার দায়িত্বে থাকা দুজন নার্স তাঁকে অনেকভাবে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। অন্য দিকে তাকাতে বলে যেই না সুইটি শরীরে ছোঁয়ালেন, অমনি মিজানুর এমন জোরে এক চিৎকার দিলেন যে হাসপাতালের চারপাশের মানুষ ভয় পেয়ে ছুটে এল! এমনকি সেই নার্স দুজনও ভড়কে গেলেন। পরে অনেক বুঝিয়ে, কান্নাকাটির মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে সুই পুশ করা হলো। রক্ত নেওয়া শেষ হওয়ার পর যখন সুই বের করা হচ্ছিল, তখন মিজানুর দিলেন শেষ চিৎকার। তাঁর এমন কাণ্ড দেখে রুমে উপস্থিত সবাই হাসিতে ফেটে পড়েন।

প্রথম দিনের সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে মিজানুর যতবারই রক্ত দিতে গেছেন, রক্ত নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আগেই অনুরোধ করে নেন—'ভাই, সুইটা একটু আস্তে দিয়েন, আমার খুব ভয় লাগে।' সুইয়ের এই ভয় কিন্তু মিজানুরকে কখনো দমাতে পারেনি। রক্ত দেওয়া শেষ হওয়ার পর যখন সেই রক্তের ব্যাগটি নিজের হাতে নেন, তখন সমস্ত ভয় উবে গিয়ে এক স্বর্গীয় আনন্দে মন ভরে ওঠে। মিজানের ভাষায়, 'ওই মুহূর্তের জন্য মনে হয় পৃথিবীতে আমার চেয়ে সুখী ও আনন্দিত মানুষ আর কেউ নেই।' নিজের শরীর থেকে দেওয়া রক্তে একজন মানুষের প্রাণ বাঁচবে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে।


বিজ্ঞাপন


এজেড

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর