সংবাদপত্রের পাতা খুললেই এখন চোখে পড়ে একের পর এক রোমহর্ষক ধর্ষণের খবর। সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা বা শিশুকে টুকরো টুকরো করার মতো নারকীয় ঘটনাগুলো আমাদের বারবার ভাবিয়ে তুলছে। অপরাধীরা অবলীলায় স্বীকারোক্তি দিচ্ছে, “আমি শুধু ধর্ষণ করেছি, খুন তো অন্যজন করেছে।”
এই বিকৃত মানসিকতা কোথা থেকে আসে? কেন আমাদের সমাজ এমন ভয়াবহ এক পরিণতির দিকে এগোচ্ছে? শুধু কঠোর আইন দিয়ে কি এই অপরাধ থামানো সম্ভব, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো নিয়ে এখনই ভাবার সময় এসেছে?
বিজ্ঞাপন

অপরাধীর মনস্তত্ত্ব: কেবল যৌন তাড়না নয়, ক্ষমতার আস্ফালন
অনেকেই মনে করেন ধর্ষণ কেবল জৈবিক তাড়নার ফল। কিন্তু চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। ট্রেইনি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী শিফাত জাহান জানান, ধর্ষণ মূলত ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বিকৃত রূপ। অপরাধীদের মধ্যে নারীবিদ্বেষী মনোভাব, সহানুভূতির চরম ঘাটতি এবং ‘না মানে হ্যাঁ’ এমন ভুল বিশ্বাস কাজ করে।
অপরাধীরা অনেক সময় অ্যান্টিসোশ্যাল বা সমাজবিরোধী ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। দক্ষিণ এশিয়া কেন্দ্রিক গবেষণায় দেখা যায়, এসব অপরাধীর অনেকেই শৈশবে কোনো না কোনোভাবে সহিংসতার শিকার হয়েছে। তবে ট্রমা কখনোই অপরাধের অজুহাত হতে পারে না। একই ধরনের ট্রমা নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ অত্যন্ত সহানুভূতিশীল হতে পারেন, আবার অন্যজন হতে পারেন ভয়ংকর অপরাধী।
বিজ্ঞাপন

ভিকটিম ব্লেমিং: সমাজের এক ভয়ংকর মানসিকতা
আমাদের সমাজে কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রথমেই ভিকটিমের পোশাক বা বাইরে যাওয়ার সময়কে কাঠগড়ায় তোলা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী মেহরাব হোসেন শিশির এই মানসিকতাকে সাইকোলজির ভাষায় ‘জাস্ট ওয়ার্ল্ড হাইপোথিসিস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। মানুষ অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করতে চায় যে ভালো মানুষের সাথে ভালোই হয়। তাই ভিকটিমের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সমাজ নিজেকে সান্ত্বনা দেয়।
এই সামাজিক দোষারোপ বা ভিকটিম ব্লেমিং একজন ভুক্তভোগীর জন্য শারীরিক আঘাতের চেয়েও মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। ক্লিনিক্যাল ভাষায় একে 'সেকেন্ডারি ট্রমা' বলা হয়। ফলে ভিকটিম তীব্র অপরাধবোধ ও লজ্জায় ভোগেন, যা অনেক সময় তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।

পর্নোগ্রাফি ও বিকৃত বিনোদনের প্রভাব
বর্তমানে হাতের মুঠোয় থাকা পর্নোগ্রাফি বা বিকৃত যৌন কনটেন্ট নারীদের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। শিফাত জাহান জানান, যারা আগে থেকেই নারীবিদ্বেষী মনোভাব লালন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এসব কনটেন্ট আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। মানুষ বারবার কোনো আগ্রাসী আচরণকে পর্দায় দেখতে থাকলে অবচেতনভাবেই নারীদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে না দেখে বস্তু হিসেবে ভাবতে শুরু করে।
সমাধান কোথায়?
এই সামাজিক অবক্ষয় রোধে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন-

পারিবারিক শিক্ষা:
পরিবারই হলো জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রথম পাঠশালা। মেহরাব হোসেন শিশির মনে করেন, ছেলেশিশুদের ছোটবেলা থেকেই ‘কনসেন্ট’ বা সম্মতির ধারণা বোঝানো উচিত। বাবা মায়ের পারস্পরিক শ্রদ্ধা দেখে শিশু শিখবে নারীদের সম্মান করতে।
সঠিক যৌন শিক্ষা:
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সঠিক যৌন শিক্ষার অভাব রয়েছে। শিফাত জাহানের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক যৌন শিক্ষা চালু করা জরুরি। এটি শিশুদের শরীর সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেবে এবং অন্যের সীমানাকে সম্মান করতে শেখাবে।

সহমর্মী সমাজ গঠন:
কোনো ঘটনা ঘটার পর ইন্টারনেটে ভিকটিমের ছবি প্রকাশ করে তার ট্রমা বাড়ানো বন্ধ করতে হবে। ভুক্তভোগীকে করুণা নয়, আইনি ও মানসিক লড়াইয়ে সাহস দিতে হবে। প্রথম ৪৮ ঘণ্টা একজন ভিকটিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখন তাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ না করে সম্পূর্ণ মানসিক সমর্থন দেওয়া পরিবারের প্রধান দায়িত্ব।
ধর্ষণ কোনো একক সমস্যা নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ব্যাধি। অপরাধের কারণ কখনো ভিকটিমের পোশাক বা সময় হতে পারে না। এর একমাত্র কারণ অপরাধীর বিকৃত মনস্তত্ত্ব। আমরা যদি আজ চুপ থাকি বা ভিকটিমকে দোষ দিই, তবে কাল আমাদের কাছের কেউই এই মানসিক বা শারীরিক সহিংসতার শিকার হতে পারে। তাই এখনই সময় দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর।
এনএম




