রান্নাঘরে কাজের ফাঁকে ফাঁকে মোবাইল ফোন স্ক্রল করছেন। হঠাৎ সামনে এলো কারোর বিদেশ ট্যুরের সুন্দর মুহূর্তের ছবি। খুশি হওয়ার বদলে মন খারাপ হলো আপনার। ভাবতে লাগলেন, ‘ওর জীবন এত গোছানো, আমারটা কেন নয়?’ অথচ আপনি হয়তো সেই ব্যক্তিকে চেনেনই না। বুঝতেই পারছেন না, নিজের অজান্তে সেই অচেনা ব্যক্তির প্রতি হিংসা হচ্ছে আপনার।
একসময় হিংসের মতো বিষয়টি পরিচিত মানুষদের ঘিরে হতো। এখন সেই গণ্ডি পেরিয়ে গেছে অপরিচিত মহলেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় অচেনা মানুষের অর্জন দেখলেও এখন হিংসা হয় মানুষের। বিশেষজ্ঞের মতে, এই অনুভূতি নতুন নয়, আগেও ছিল। অন্যের সাজানো জীবন, হাসিমুখ, সাফল্যের ঝলক মিলিয়ে আমরা কল্পনার জগতে একটা ‘পারফেক্ট’ জীবন কল্পনা করে নিই। আর সেই ছবির সঙ্গে যখন নিজের বাস্তবকে মেলাতে যাই তখন নিজেকে ছোট মনে হয়।
বিজ্ঞাপন

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘প্যারাসোশ্যাল জেলাসি’ (parasocial jealousy)। অর্থাৎ এমন একজনকে কেন্দ্র করে হিংসে, বাস্তবে যার সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই। অথচ তাকে ঘিরে হিংসা মনে ঠিকই জায়গা করে নিয়েছে। কীভাবে বুঝবেন আপনি প্যারাসোশ্যাল জেলাসির ফাঁদে পড়েছেন? চলুন জেনে নিই-
ইমোশনাল ‘স্ক্রল লুপ’-এ আটকে পড়া
হয়তো ভাবছেন, শুধু সময় কাটানোর জন্যই সোশ্যাল মিডিয়া দেখছেন। কিন্তু অজান্তেই বার বার একই মানুষের প্রোফাইলে চেক করছেন। কোনো কারণ ছাড়াই বারবার দেখছেন— সে কী করছে? কোথায় যাচ্ছে? কীভাবে দিন কাটাচ্ছে? আপনার মন যেন নিজের মতো করে একটা লুপে আটকে গিয়েছে। স্বীকার না করলেও আপনার মনে ভেতরে ভেতরে তুলনা চলতেই থাকে— আপনি কোথায় পিছিয়ে?
বিজ্ঞাপন

অন্যের ‘দেখানো জীবন’ এর সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা
আপনি জানেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সব কিছু সত্যি নয়। তবুও রিলসের সেই ফিল্টারড মুহূর্তগুলোকে সত্য ভেবে বসেন। অন্যের সেরা সময়গুলোর সঙ্গে নিজের খারাপ দিনগুলোর তুলনা করেন। এতে ধীরে ধীরে নিজের জীবনটাই ফাঁকা মনে হতে থাকে। নিজেকে অযোগ্য মনে হয়। নিজের জীবনের অপ্রাপ্তিগুলো বারবার মনে উঁকি দেয়।
নিজেকে বদলানোর চাপ
হয়তো খেয়ালই করেননি, সময়ের সঙ্গে কখন নিজের পোশাক, লাইফস্টাইল, এমনকি টার্গেটও বদলাতে শুরু করেছেন। কাউকে সরাসরি কপি করছেন না ঠিকই, কিন্তু তার মতো হতে চাইছেন। তাতেই যেন সময়ের সঙ্গে হারাতে থাকেন নিজের সত্ত্বাকে।

অজান্তে তৈরি হওয়া প্রতিযোগিতা
নিজের অজান্তেই প্রতিযোগিতার খাতায় নাম লিখিয়েছেন আপনি। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো— এই প্রতিযোগিতা একতরফা। যাকে আপনি প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছেন, সে হয়তো আপনার অস্তিত্ব সম্পর্কেই অবগত নয়। তবুও মনে হয় যেন একটা অদৃশ্য রেস চলছে, আর আপনাকে জিততেই হবে। বাইরে থেকে আপনি স্বাভাবিকই থাকেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা অস্থিরতা কাজ করে— ‘আমি যথেষ্ট নই।’ এই অনুভূতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
‘মোটিভেশন’ ভেবে ভুল করা
অনেকে ভাবেন, এই তুলনা তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। কিন্তু আসলে এই মোটিভেশন অত্যন্ত খারাপ। কারণ এর ভিত্তি অন্যের জীবন। ফলে আপনি যতই এগোন, সবসময়ই কেউ না কেউ আরও ‘ভালো’ থাকবে— আর সেই তুলনা শেষ হবে না।

আপনার জীবনে এমন কিছু ঘটলে একটু থামুন। ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, যা করছেন ঠিক করছেন তো? নিজেকে ঠকাচ্ছেন না তো? মনে রাখবেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখানো জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তাই সেই মোহে ভেসে নিজের মধ্যে অযথা উদ্বেগ তৈরি করা বোকামি।
এনএম




