বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

আতঙ্কের খাতায় নতুন নাম ‘জলাতঙ্ক’, সচেতনতাই ভরসা

লাইফস্টাইল প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

শেয়ার করুন:

আতঙ্কের খাতায় নতুন নাম ‘জলাতঙ্ক’, সচেতনতাই ভরসা
বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন এবং প্রতিবছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যান

আতঙ্ক যেন দেশবাসীর পিছুই ছাড়ছে না। ডেঙ্গু নিয়ে ভয়ে দিন কাটাতে কাটাতে দুয়ারে এসে হাজির হাম। হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা রোগটি ইতোমধ্যেই কেড়ে নিয়েছে শ’ কয়েক শিশুর প্রাণ। আরও অসংখ্য শিশু লড়ছে হামের উপসর্গের সঙ্গে। এরইমধ্যে আতঙ্কের খাতায় যোগ হয়েছে নতুন নাম। জলাতঙ্ক। যদিও হামের মতো এই রোগটি এখনো অতটা ব্যাপ্তি ছড়ায়নি তবে জনমনে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই। 

জলাতঙ্ক কী? 

জলাতঙ্ক। ভেঙে বললে জলের প্রতি আতঙ্ক। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যার নাম হাইড্রোফোবিয়া। অনেকে আবার পাগলা রোগ নামেও চেনেন। আক্রান্ত রোগী পানি দেখে বা পানির কথা মনে পড়লে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। জলের প্রতি এই আতঙ্কের কারণেই এই রোগের নাম হয়েছে জলাতঙ্ক। এটি প্রাণিবাহিত র‌্যাবিস ভাইরাসঘটিত রোগ। রোগের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর আক্রান্ত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

জলাতঙ্ককে হালকা ভাবে নেওয়ার উপায় নেই। জানলে অবাক হবেন, বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন এবং প্রতিবছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ জলাতঙ্ক রোগে মারা যান। বাংলাদেশেও বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী মৃত্যুবরণ করেন জলাতঙ্কে। কেবল মানুষ নয়, আমাদের দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৫ হাজার গবাদিপশুও জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে থাকে।  

rabies_1

জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয় কীভাবে? 

সাধারণত কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি, বানর ইত্যাদি প্রাণী জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এবং আক্রান্ত প্রাণীটি সুস্থ মানুষ বা গবাদিপশুকে কামড়ালে ওই মানুষ কিংবা গবাদিপশুও এ রোগে আক্রান্ত হয়। তবে আমাদের দেশে জলাতঙ্কের কথা বললেই উঠে আসে কুকুরের নাম। কারণ এখানে ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগ হয় কুকুরের কামড়ে। এই কুকুরে কামড়ানো ব্যক্তির ৪০ শতাংশের বয়সই ১৫ বছরের কম। 

আক্রান্ত প্রাণীর মুখের লালায় জলাতঙ্কের ভাইরাস থাকে। ভাইরাস বহনকারী এই লালা সুস্থ ব্যক্তির শরীরে পুরনো ক্ষতের বা দাঁত বসিয়ে দেওয়া ক্ষতের মাধ্যমে কিংবা সামান্য আঁচড়ের মাধ্যমে রক্তের সংস্পর্শে এলে বা অতি দুর্লভ ক্ষেত্রে আক্রান্ত প্রাণীর লালা থেকে সৃষ্ট অ্যারোসল বাতাসের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তির ফুসফুসে প্রবেশ করলে র‌্যাবিস ভাইরাস ধীরে ধীরে প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে আক্রান্ত হয় গলবিল এবং খাদ্যনালির মাংসপেশির কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুও। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণী সুস্থ ব্যক্তিকে কামড়ানোর ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে থাকে। তবে এ সময়সীমা এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্তও হতে পারে।

জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণ কেমন হয়? 

কেবল পানির প্রতি আতঙ্কই নয়, জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণেও কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। অস্বাভাবিক কথাবার্তা ও ভাবভঙ্গি, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো, ক্ষুধামান্দ্য, খাওয়াদাওয়ায় অরুচি, বিকৃত আওয়াজ, কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, বিনা প্ররোচনায় অন্যকে আক্রমণ বা কামড় দেওয়ার প্রবণতা ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ করতে পারেন। 

rabies

আক্রান্ত ব্যক্তির প্রচণ্ড পানির পিপাসা পেলেও পানি দেখলেই তিনি আতঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়েন। আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এলে এ ভীতি আরও বেড়ে যায়। এ জন্য জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তি অন্ধকার ও মানুষের চোখের আড়ালে একাকী থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তবে শুধু পানি নয়, আক্রান্ত ব্যক্তির খাবার খেতেও কষ্ট হয়। খিঁচুনিসহ মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা নিঃসৃত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষাঘাত, শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়া, ঝিমুনি হওয়া, ক্ষতস্থানে অবশতা ও অসারতা অনুভূত হওয়া ইত্যাদি লক্ষণও প্রকাশ পেতে পারে। শরীরের শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু ও মাংসপেশি দুর্বল হয়ে পড়লে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। কষ্টদায়ক এসব লক্ষণের কারণে রোগী শেষ পর্যন্ত অবধারিতভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে টিকা গুরুত্বপূর্ণ

সাধারণত লক্ষণ দেখা দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই রোগী মারা যান। কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে না। কিছু উপশম প্রশমনের চিকিৎসা ছাড়া জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে তেমন কার্যকর কোনো চিকিৎসাও নেই। জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে। রোগের লক্ষণ প্রকাশের আগে শরীরে এই টিকা প্রয়োগ করতে পারলেই কেবল মৃত্যু এড়ানো যায়।

জলাতঙ্কের জন্য দুই ধরনের টিকা রয়েছে। ক্ষতের তীব্রতা ও আধিক্যের ওপর ভিত্তি করে কারও ক্ষেত্রে এক ধরনের, আবার কারও কারও ক্ষেত্রে উভয় ধরনের টিকা প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে। পশু কামড়ানো বা আঁচড়ানোর পর যত তাড়াতাড়ি জলাতঙ্কের এ টিকা গ্রহণ করা যায়, ততই মঙ্গল। সাধারণত প্রথম দিন টিকা দেওয়ার পর ৩, ৭, ১৪, ২৮ ও ৯০তম দিনে টিকার মোট ৬টি ডোজ প্রয়োগ করতে হয়। নাভির চারপাশে চামড়ার নিচে এ টিকা নেওয়া হয়। টিকার সব কটি ডোজ সময়মতো গ্রহণ করে টিকার কোর্স সম্পন্ন করা আবশ্যক।

jolatongko_1

কাদের জন্য জলাতঙ্কের টিকা বেশি জরুরি? 

সচরাচর ইঁদুর, খরগোশ, কাঠবিড়ালি, গুইসাপ ইত্যাদি প্রাণী জলাতঙ্ক ছড়ায় না। তাই এ ধরনের প্রাণী কামড়ালে জলাতঙ্কের টিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। পশুচিকিৎসক, চিড়িয়াখানার প্রাণীদের দেখাশোনাকারী, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত ব্যক্তি বা উক্ত এলাকায় ভ্রমণকারী ব্যক্তি ও যারা বাড়িতে কুকুর বা বিড়াল পোষেন, তাদের জলাতঙ্কের প্রতিরোধমূলক টিকা নেওয়া বেশি জরুরি। এ ধরনের ব্যক্তিদের ০, ৭ ও ২১ বা ২৮তম দিনে টিকার তিনটি ডোজ ও প্রতিবছর বুস্টার ডোজ গ্রহণ করতে হয়। 

প্রাণীদেরও টিকা দিতে হবে

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে পোষা ও অ-পোষা সব বিড়াল-কুকুরকে জলাতঙ্কের টিকা কার্যক্রমের আওতায় আনাও একটি কার্যকর উপায়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই মৃত্যুদূত ব্যাধিকে করায়ত্ত করা সম্ভব।

প্রাণী কামড়ালে করণীয় 

কোনো সন্দেহজনক বা অচেনা প্রাণী আঁচড় বা কামড় দিলে শুরুতেই আক্রান্ত স্থানে ক্ষত ও রক্তপাতের তীব্রতা খেয়াল করুন। প্রথমেই ক্ষতস্থান চেপে ধরুন যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর টিউবওয়েল বা কলের পানি দিয়ে প্রবহমান পানির ধারার নিচে ন্যূনতম দশ মিনিট ধরে ক্ষত পরিষ্কার করুন। সম্ভব হলে কোনো অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবানও ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ভাইরাসসহ ক্ষতে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করবে।

rabies_2

ক্ষত পরিষ্কার হয়ে গেলে দেরি না করে ক্ষত–পরবর্তী সংক্রমণের হার কমানোর জন্য নিকটতম চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে ক্ষতস্থান পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট দ্রবণ দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করিয়ে নিন। অতঃপর ক্লোরহেক্সিডিন বা পোভিডোন আয়োডিন দিয়ে ক্ষতস্থানটিকে ভালো করে পরিষ্কার করান। এতে অর্ধেকের বেশি জলাতঙ্কের ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। এরপর ক্ষতে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক মলমের প্রলেপ প্রয়োগ করে একটি জীবাণুমুক্ত গজ কাপড় দিয়ে ব্যান্ডেজ করে ফেলুন। ক্ষতস্থানে কোনো সেলাই দেওয়া যাবে না।

প্রয়োজনীয় ব্যথানাশক ওষুধ সেবন ও পথ্যের পাশাপাশি অবশ্যই প্রতিদিন আঁচড় বা কামড়ের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে হবে। কাটা স্থান যেন ধুলাবালি ও ময়লা মুক্ত থাকে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। ক্ষত প্রদাহ শুকিয়ে আসা অবধি এই নিয়ম মেনে চলতে হবে।

ক্ষতস্থানে স্যালাইন, বরফ, চিনি, লবণ, ইলেকট্রিক শক ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না। বাটিপড়া, পানপড়া, চিনিপড়া, মিছরিপড়া, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি জলাতঙ্কের হাত থেকে কাউকে রক্ষা করতে পারে না। ক্ষতস্থান কখনোই অন্য কিছু দিয়ে কাটা, চোষণ করা বা ব্যান্ডেজ করা যাবে না। এছাড়া কোনো কবিরাজ বা ওঝার শরণাপন্ন হয়ে কোনো অবৈজ্ঞানিক কিংবা অপচিকিৎসা গ্রহণ করবেন না। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। 

rabies_3

সম্ভব হলে আক্রমণকারী প্রাণীর দিকে লক্ষ রাখুন। আক্রমণের কিছুদিনের মাঝে প্রাণীটি মারা গেলে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। এরকম হলে প্রয়োজনে বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে অবগত করুন। 

জলাতঙ্ক নিয়ে কেবল আতঙ্কিত না হয়ে রোগটির ব্যাপারে সচেতন হন। এটিই সম্ভাব্য বিপদ কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায়। 

এনএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর