রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ঢাকা

মনের কোণে মেঘ জমেছে? 

তানজিদ শুভ্র
প্রকাশিত: ২৯ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

মনের কোণে মেঘ জমেছে? 

হঠাৎ করেই কি আপনার কখনো মনে হয়েছে চারপাশের চেনা পৃথিবীটা বড্ড অচেনা লাগছে? কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে আসে। কখনো আবার সুনির্দিষ্ট কোনো ঘটনার জের ধরে মন খারাপের মেঘ জমে। এই যে আমাদের মন খারাপ হয়, কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন এমনটা ঘটে? খুব সহজ ও সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে, মন খারাপ কোনো অসুখ নয়। এটি আমাদের শরীর, মস্তিষ্ক এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রতি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মানবিক প্রতিক্রিয়া। মানুষ হিসেবে আমাদের অনুভূতির যে বৈচিত্র্য, মন খারাপ তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মন খারাপের পেছনে সবচেয়ে বড় ও বিজ্ঞানসম্মত কারণটি হলো আমাদের শরীরের ভেতরের রাসায়নিক খেলা। আমাদের মস্তিষ্কে কিছু বিশেষ হরমোন বা রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যেমন ডোপামিন, সেরোটোনিন ও এন্ডোরফিন। এই উপাদানগুলোকে বলা যায় আমাদের মন ভালো রাখার জ্বালানি। যখন আমাদের জীবনে আনন্দের কিছু ঘটে, তখন মস্তিষ্ক এই হরমোনগুলো নিঃসরণ করে। কিন্তু শারীরিক ক্লান্তি, টানা কয়েক রাত ঠিকমতো ঘুম না হওয়া, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো চাপের কারণে এই হরমোনগুলোর মাত্রা কমে যায়। আর ঠিক তখনই আমরা কোনো কারণ ছাড়াই গভীর বিষণ্ণতা অনুভব করি। 


বিজ্ঞাপন


আবহাওয়াও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, একটানা কয়েকদিন বৃষ্টি হলে বা রোদের দেখা না মিললে অনেকেই কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েন। এর কারণ হলো সূর্যের আলোর অভাবে আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি এবং মন ভালো রাখার হরমোনগুলোর উৎপাদন কমে যায়।

sad_2

মন খারাপের আরেকটি বিশাল জায়গা জুড়ে আছে আমাদের মনস্তত্ত্ব এবং প্রত্যাশার হিসাব নিকাশ। আমরা প্রতিটি মানুষই জীবনে কিছু না কিছু প্রত্যাশা নিয়ে বাঁচি। সেটি হতে পারে ক্যারিয়ার নিয়ে, প্রিয়জনের আচরণ নিয়ে বা নিজের ব্যক্তিগত কোনো লক্ষ্য নিয়ে। যখন আমাদের সেই প্রত্যাশাগুলো বাস্তবের কঠিন মাটিতে আছড়ে পড়ে ভেঙে যায়, তখন মন স্বাভাবিকভাবেই বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহটাই হলো মন খারাপ। পরীক্ষায় খারাপ ফল, কর্মক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়া, কিংবা প্রিয় মানুষের সামান্য একটু অবহেলা আমাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। অনেক সময় আমরা আমাদের ভেতরের রাগ, অভিমান বা কষ্টগুলো কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারি না। দিনের পর দিন এই না বলা কথাগুলো বুকের ভেতর জমতে থাকে। জমাট বাঁধা সেই কষ্টের পাহাড় যখন আর নেওয়া যায় না, তখন খুব তুচ্ছ কোনো কারণেও আমরা হু হু করে কেঁদে ফেলি।

আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতা এবং আমাদের বর্তমান জীবনযাপন মন খারাপের মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে বাস করি যেখানে সবাই সবার সাথে ভার্চুয়ালি যুক্ত, কিন্তু বাস্তবে আমরা ভীষণ একা। চার দেয়ালের বন্দি জীবনে আমাদের হাঁসফাঁস অবস্থা। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে আমরা সারাদিন অন্যদের হাসি খুশিতে ভরা ছবি বা সফলতার গল্প দেখি। অবচেতনভাবেই আমরা নিজেদের সাধারণ জীবনের সাথে অন্যের সেই সাজানো জীবনের তুলনা করতে শুরু করি। আমাদের মনে হতে থাকে, পৃথিবীর সবাই বোধহয় খুব আনন্দে আছে, শুধু আমার জীবনেই কোনো প্রাপ্তি নেই। এই অহেতুক ও অবাস্তব তুলনা আমাদের ভেতরে গভীর একাকীত্ব ও হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়।


বিজ্ঞাপন


sad_3 

পাশাপাশি, প্রকৃতির সাথে আমাদের বাড়তে থাকা দূরত্ব এই বিষণ্ণতাকে আরও গাঢ় করে তোলে। কংক্রিটের শহরে একটানা ছুটে চলতে চলতে আমাদের মস্তিষ্ক যখন হাঁপিয়ে ওঠে, তখন সে মন খারাপের সিগন্যাল দিয়ে আমাদের থামাতে চায়।

এখন একটি জরুরি প্রশ্ন আসতে পারে। মন খারাপের কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? এর উত্তর হলো, হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। সারাজীবন কেবল খুশি থাকাটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের লক্ষণ হতে পারে না। মন খারাপ আমাদের জীবনে একটি বিরতির মতো কাজ করে। একটানা দৌড়াতে দৌড়াতে যখন আমরা খেই হারিয়ে ফেলি, তখন এই বিষণ্ণতা আমাদের কিছুটা সময় একাকী থাকতে বাধ্য করে। এটি আমাদের নিজেদের ভেতরের ক্ষতগুলো সারিয়ে তোলার সুযোগ দেয়। জীবনের ভুল সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবার পথ তৈরি করে। খেয়াল করলে দেখবেন, পৃথিবীর অনেক দারুণ সাহিত্য, কবিতা বা শিল্পের জন্ম হয়েছে মানুষের গভীর বিষাদ থেকে। মন খারাপ আমাদের আরও বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। যে মানুষটি নিজে কষ্ট পেয়েছেন, তিনি খুব সহজেই অন্য মানুষের কষ্টটা অনুভব করতে পারেন।

sad_4

তাই মন খারাপ হলে ঘাবড়ে যাওয়ার বা নিজেকে লুকিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। এটি আকাশের মেঘের মতো, যা বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার পর আকাশকে আরও পরিষ্কার করে দেয়। মন খারাপের দিনগুলোতে নিজের প্রতি একটু বেশি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। 

পছন্দের কোনো বই পড়া, ডায়েরির পাতায় মনের কথাগুলো লিখে ফেলা বা প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটানো এই মেঘ কাটাতে দারুণ সাহায্য করতে পারে। বিষণ্ণতাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিতে শিখলে বেঁচে থাকার আনন্দগুলো আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। 

এনএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর