দেশি-বিদেশি যত বাহারি খাবারই হোক না কেন, ভাত না খাওয়া পর্যন্ত বাঙালির শান্তি মেলে না। তাইতো ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। ভাত রান্নার জন্য কেউ আতপ চাল ব্যবহার করেন। আবার কেউ খান সেদ্ধ চালের ভাত? পুষ্টিগুণের দিক থেকে কোনটি এগিয়ে? কার জন্য কোন চালের ভাত উপকারি? চলুন জানা যাক-
চালের পুষ্টিগুণ নির্ভর করে ধান থেকে চাল তৈরির পদ্ধতির ওপর। ধানকে সরাসরি শুকিয়ে তুষ ছাড়িয়ে যে চাল পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় আতপ চাল। অন্যদিকে, ধানকে প্রথমে ভিজিয়ে, হালকা ভাপে সেদ্ধ করে তারপর শুকিয়ে যে চাল তৈরি হয়, তাকে বলা হয় সেদ্ধ চাল। এই সামান্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিই দুই প্রকার চালের পুষ্টিগুণে বিশাল পার্থক্য তৈরি করে দেয়।
বিজ্ঞাপন

পুষ্টির লড়াইয়ে কে এগিয়ে?
পুষ্টিবিদদের মতে, আতপ চালের তুলনায় সেদ্ধ চাল অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। এর কারণ হলো, যখন ধান সেদ্ধ করা হয়, তখন ধানের খোসা বা তুষের মধ্যে থাকা ভিটামিন এবং খনিজগুলো (যেমন ভিটামিন বি এবং পটাশিয়াম) চালের ভেতরে প্রবেশ করে।
সেদ্ধ চাল: এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফাইবার থাকে। এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) আতপ চালের চেয়ে কম, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়তে দেয় না।
বিজ্ঞাপন
আতপ চাল: এটি তৈরির সময় তুষের সাথে সাথে এর ওপরের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির স্তরটিও বাদ পড়ে যায়। ফলে এটি মূলত কার্বোহাইড্রেটের উৎস হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু এতে ফাইবার বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট খুব কম থাকে।

কাদের কোন চাল খাওয়া উচিত?
১. ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য:
যাদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি, তাদের জন্য সেদ্ধ চাল বা বিশেষ করে 'ব্রাউন রাইস' আদর্শ। সেদ্ধ চালে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেশি থাকায় এটি রক্তে ধীরে ধীরে গ্লুকোজ মেশায়। অন্যদিকে আতপ চাল খুব দ্রুত হজম হয়ে রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, তাই এটি এড়িয়ে চলাই ভালো।
২. হজমের সমস্যা থাকলে:
আতপ চাল খুব হালকা এবং সহজে হজমযোগ্য। যাদের পেটের গোলমাল বা হজমে সমস্যা রয়েছে (যেমন ছোট শিশু বা বয়স্ক ব্যক্তি), তাদের জন্য আতপ চালের ভাত বেশি আরামদায়ক। সেদ্ধ চাল হজম হতে কিছুটা বেশি সময় নেয়।

৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে:
যারা ওজন কমাতে ডায়েট করছেন, তাদের জন্য সেদ্ধ চাল সেরা। এতে থাকা ফাইবার পেট দীর্ঘক্ষণ ভরিয়ে রাখতে সাহায্য করে, ফলে বারবার খাওয়ার প্রবণতা কমে।
৪. হার্টের স্বাস্থ্য ও কোলেস্টেরল:
সেদ্ধ চালে থাকা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারি। হার্টের রোগীদের জন্য আতপ চালের চেয়ে সেদ্ধ চাল বা ঢেঁকি ছাঁটা চাল বেশি ফলপ্রসূ।

স্বাদের ভিন্নতা
আতপ চাল বিখ্যাত সুগন্ধ এবং ঝরঝরে ভাবের জন্য। পোলাও, বিরিয়ানি বা পায়েসের মতো সুস্বাদু পদে আতপ চালের কোনো বিকল্প নেই। অন্যদিকে, সেদ্ধ চাল কিছুটা মোটা হয় এবং এর নিজস্ব কোনো তীব্র সুগন্ধ নেই, তবে প্রতিদিনের আহার হিসেবে এটি পেট ভরা রাখতে বেশি কার্যকর।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আপনি যদি কেবল স্বাদ ও সুগন্ধ চান, তবে আতপ চাল খেতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টির কথা ভাবলে অবশ্যই সেদ্ধ চাল খেতে হবে। আধুনিক জীবনযাত্রায় যেখানে ডায়াবেটিস ও ওবেসিটি ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে, সেখানে সুস্থ থাকতে সেদ্ধ চালের ভাতের ওপর ভরসা রাখাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
এনএম

