একসময় ছিল, যখন বার্ষিক পরীক্ষার আগে স্কুলের বারান্দায় ভেসে আসত দোয়া-মিলাদের সুর। শিক্ষকরা মাথায় হাত রেখে দোয়া দিতেন, অভিভাবকরা কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজিয়ে তাকিয়ে থাকতেন, আর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগের টানটান উত্তেজনার মাঝেও এক ধরনের পবিত্র শান্তির স্পর্শ পেত।
বর্তমানে সেই দৃশ্য ক্রমশ বিরল। তার জায়গা দখল করেছে ক্লাস পার্টি, যেখানে জাঁকজমক, ডিজে, আলো-ঝলমল আর নাচ-গানের উচ্ছ্বাসে ভরপুর আয়োজন আর ভিডিও বানানোর উন্মাদনা। পরিবর্তন, সময় চাহিদায় হোক বা প্রভাবের কারণে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি আমাদের শিক্ষার্থী সমাজকে সহায়তা করছে, নাকি এক অদৃশ্য ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
বিজ্ঞাপন
প্রথমেই মানতে হবে, ক্লাস পার্টি নামের এই নতুন ট্রেন্ডে কিছু ভালো দিকও আছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। দীর্ঘসময় ধরে পড়াশোনা, পরীক্ষা, টিউশন আর প্রতিযোগিতার চাপ শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে তোলে। একটু সহপাঠীসুলভ আড্ডা, খাওয়াদাওয়া বা সাদামাটা বিনোদন তাদের মনকে হালকা করে, পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর করে। অনেক শিক্ষার্থী আছে, যাদের নাচ-গান বা উপস্থাপনায় প্রতিভা রয়েছে; ক্লাস পার্টি তাদের সেই প্রতিভা দেখানোর একটা ক্ষেত্র তৈরি করে। বন্ধুত্ব, দলগত কাজ আর স্মৃতিবিনিময়ের এই আয়োজন নিয়ন্ত্রিত থাকলে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশেও ভূমিকা রাখে এটা সত্য।
একটা পার্টি আয়োজন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদেরই পরিকল্পনা করতে হয়- কে সাজাবে, কে গান বাজাবে, কে কেক আনবে, কে ছবি তুলবে। এই সবকিছু দলবদ্ধভাবে করতে গিয়ে তাদের নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ আর সংগঠনের দক্ষতা বাড়ে। ভবিষ্যতে যে কোনো নেতৃত্বমূলক কাজে এসব অভিজ্ঞতা কাজে আসে।
একজন শিক্ষার্থীর মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে চাইলে পড়াশোনার পাশাপাশি আনন্দও দরকার। পরীক্ষা-উৎসব-উদযাপন সবই জীবনের অংশ। ক্লাস পার্টি যদি নিয়ন্ত্রিত ও শালীন পরিবেশে হয়, তাহলে এটা পরীক্ষার আগে তাদের চাপ কমাতেও সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন এই আনন্দ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
ক্লাস পার্টি মানেই সব ইতিবাচক এটা ভাবারও সুযোগ নেই। বরং সাম্প্রতিক বছরে এই উৎসব যে রূপ নেওয়া শুরু করেছে, সেটাই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা। গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে, ক্লাস পার্টির নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবেশ করেছে এমন কিছু উপাদান, যা একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। উচ্চস্বরে ডিজে মিক্স, নাচ-গানের বিশৃঙ্খলা এসব কি সত্যিই স্কুলের পরিবেশের সঙ্গে মানানসই?
বিজ্ঞাপন
কিশোর বয়সে অনুকরণ প্রবণতা বেশি, তাই তারা সোশ্যাল মিডিয়ার পার্টি কালচার দেখে স্কুলেও একই রকম আয়োজন করতে চায়। কিন্তু এতে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এই উচ্ছ্বাসের মাঝে কখন যে শালীনতা ভেঙে যায়, সেটা তারা নিজেরাও টের পায় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি দুশ্চিন্তা-অতিরিক্ত খরচ। ক্লাস পার্টি মানেই সাজগোজ, খাবার, সাজসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম সব মিলিয়ে খরচ বাড়ছে হু হু করে। যার পরিবারের সামর্থ্য কম, সে অস্বস্তিতে পড়ে। কেউ কেউ চাপে পড়ে বাড়তি টাকা খরচ করে শুধু “কম দেখাবে” না এই ভয়ে। এই অযাচিত প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের ভেতরেও জন্ম দিচ্ছে বৈষম্য- কে বেশি দামি পোশাক পরল, কে বেশি দামী কেক আনল এ সবই অপ্রয়োজনীয় তুলনা ও মানসিক চাপ তৈরি করছে।
দোয়া-মিলাদ হতো আত্মশুদ্ধি, নম্রতা, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা আর পরীক্ষার আগে মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। এখন ক্লাস পার্টি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে অন্য এক জগতে, উদযাপন ও উচ্ছ্বাসের জগতে। সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া এসব আয়োজন শিক্ষার্থীদের অমনোযোগী করে তুলছে যা পরীক্ষার আগে মোটেও কাম্য নয়।
আরও ভাবনার বিষয় হলো নিরাপত্তা। উচ্চ শব্দ, ভিড়, উত্তেজনা এসবের মাঝে ছোটখাটো দুর্ঘটনা যেকোনো সময় ঘটতে পারে। কখনো শিক্ষকরা পুরো পার্টির পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, ফলে বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে। কিশোর বয়সে দায়-দায়িত্বের বোধ কম থাকে, উত্তেজনা বেশি থাকে এই দুটি মিললে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
দেশি সংস্কৃতির জায়গা দখল করছে ফিউশন কালচারের পার্টি পরিবেশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পড়ালেখা শেখায় না- মূল্যবোধ, ভদ্রতা, আচরণবিধিও শেখায়। কিন্তু কিছু কিছু ক্লাস পার্টিতে নাচ-গান, ফটোশ্যুট, টিকটক বানানো, যুগল ছবি তোলা এসব ধীরে ধীরে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তাহলে কি ক্লাস পার্টি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা উচিত? না। সময়ের পরিবর্তনকে অস্বীকার করা যায় না। শিক্ষার্থীদের আনন্দের দরকার আছে, প্রয়োজন আছে নিজেদের ভেতরের সৃজনশীলতা প্রকাশ করার। কিন্তু আনন্দ যদি মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে সেটা আনন্দ নয়—ভবিষ্যতের জন্য বিপদ। তাই প্রয়োজন—সমন্বয়, ভারসাম্য আর সঠিক দিকনির্দেশনা।
স্কুলগুলো চাইলে সহজ, সাদামাটা, শালীন ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ক্লাস পার্টি আয়োজন করতে পারে। নাটক, কবিতা, গল্প বলা, সংগীত পরিবেশন, ছোট প্রদর্শনী এসব আয়োজনে সমৃদ্ধ করা যায় ক্লাস পার্টি। এতে আনন্দও থাকে, শিক্ষামূল্যও বজায় থাকে। কিন্তু থাকবে না অশালীনতা, অতিরিক্ত আড়ম্বর বা এমন কোনো উপাদান যা শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করে।
অভিভাবক ও শিক্ষকরা যদি একসঙ্গে শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দেন, তবে এই আয়োজন স্বাস্থ্যকর রূপ পেতে পারে। একই সঙ্গে দোয়া-মিলাদের মতো ইতিবাচক ঐতিহ্যও টিকে থাকতে পারে—যা শিক্ষার্থীদের মনে শান্তি, সংযম ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।
শেষ কথা হলো স্কুল হলো জীবনের ভিত্তি। এখানে যে অভ্যাস তৈরি হয়, তা ভবিষ্যৎ জীবনকে গঠন করে। ক্লাস পার্টি উৎসবের অংশ হতেই পারে, কিন্তু সেটি যেন কখনো শিক্ষার আলোকে ঢেকে না ফেলে। উচ্ছ্বাস থাকবে, আনন্দ থাকবে—কিন্তু সবই হবে শালীনতার ছায়ায়, নিয়ন্ত্রণের কাঠামোর ভেতরে। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামীর সমাজ নির্মাতা। তাদের পথচলা যেন দিশেহারা না হয়, বরং আনন্দ ও দায়িত্ব—দুইয়ের ভারসাম্যে তারা গড়ে ওঠে সুস্থ, সৃজনশীল ও সুশীল নাগরিক হিসেবে—এই প্রত্যাশাই সবচেয়ে বড়।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
এনএম

