শিক্ষার্থীদের কিস্তিতে পোশাক দেন নারী উদ্যোক্তা সচি

প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২২, ১০:১৭ এএম
শিক্ষার্থীদের কিস্তিতে পোশাক দেন নারী উদ্যোক্তা সচি

জীবনকে উপভোগ করার বিষয়টি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কেউ ভীষণ ক্যারিয়ার সচেতন। কেউবা আবার জীবিকার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেন নিজের ভালোলাগাকে। দ্বিতীয় দলের একজন নারী যারিন রওনক সচি। ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে বর্তমানে একটি বেসরকরি প্রতিষ্ঠানে এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তবে চাকরিজীবী পরিচয় দেওয়ার চেয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দেশীয় ও ভারতীয় নারী পোশাকের অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘কুমুদিনীর বসন’ এর কর্ণধার এই তরুণ। 

নিজের বেড়ে ওঠা এবং ব্যবসার নানা দিক নিয়ে আড্ডা হয় তার সঙ্গে। জানা যায় একজন নারীর অন্য নারীদের কর্মের যোগানদাতা হওয়ার গল্প। 

ঢাকার মেয়ে সচি। বাবার চাকরির সুবাদে বুয়েটের কলোনিতে বেড়ে ওঠেন। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সি কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইনফরমেশন সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। 

sochiছোটবেলা থেকেই শাড়ির প্রতি আলাদা টান ছিল সচির। নিজে শাড়ি পরতেও ভীষণ ভালোবাসেন। স্নাতক শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। স্নাতকোত্তর পড়া শুরু করলে চাকরি ছেড়ে দেন। কর্মক্ষেত্র আর বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব অনেক হওয়ায় নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। সেসময় সচি ভাবতে লাগলেন কী করা যায়। যেহেতু শাড়ির প্রতি আলাদা ভালোবাসা ছিল তাই ব্যবসার ক্ষেত্র হিসেবে সেটিই নির্বাচিত করলেন। ভালোমানের দেশীয় শাড়ির সঙ্গে শাড়িপ্রেমীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবনের। 

২০১৭ সাল থেকে ব্যবসা করছেন এই নারী উদ্যোক্তা। প্রথমদিকে কেবল শাড়ি নিয়ে কাজ করলেও বর্তমানে কাফতান, কুর্তি, সেলোয়ার কামিজ নিয়েও কাজ করছেন সচি। দেশি শাড়ির পাশাপাশি বিক্রি করছেন ভারতীয় শাড়ি বা পোশাকও। এছাড়া নারীদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন-ব্যাগ, জুতা ইত্যাদিও পাওয়া যায় কুমুদিনীর বসনে। 

হুট করে ব্যবসায় নেমেই সফল হননি সচি। তিনি এগিয়েছেন ধীর পায়ে। মাত্র ৩ হাজার টাকা মূলধনে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। অল্প লাভে পণ্য বিক্রি করে বাড়ান চলতি মূলধন। নতুন পণ্য কেনেন তা দিয়ে। এভাবে নিজের ব্যবসার পরিধি বাড়ান এই উদ্যোক্তা। শুরুতে তাঁতিদের থেকে শাড়ি এনে বিক্রি করতেন। বর্তমানে কয়েকজন নিজস্ব কারিগর রয়েছে সচির। তিনি নিজে নকশা, রঙ পছন্দ করেন। সেই অনুযায়ী কারিগররা শাড়ি বা পোশাক বানিয়ে দেন। কখনো শাড়ির পাড়ে তুলে ধরেন প্রিয় গানের দুই কলি। কখনো বা শাড়ির পুরো শরীর সাজান নির্দিষ্ট কোনো থিমে। এই যেমন সম্প্রতি সত্যজিৎ রায় আর রাশি থিমে শাড়ি তৈরি করেছেন। স্ক্রিনপ্রিন্টের এসব শাড়ি ক্রেতাদের কাজে বেশ সমাদৃত হয়েছে। 

sochi৫ থেকে ১০ বছর আগে ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি পোশাকেই নারীদের বেশি আগ্রহ ছিল। কিন্তু গত ২-৩ বছরে দেশি পোশাকেও আগ্রহী হচ্ছেন তারা। কেন এমনটা হচ্ছে বলে মনে হয়? জানতে চাইলে সচি বলেন, ‘আমি দেশি পোশাক নিয়ে কাজ করি। ভারতীয় পোশাক নিয়েও কাজ করি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়, ক্রেতাকে যদি সহনীয় মূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য দেওয়া যায় তাহলে তারা দেশি পোশাকেও আগ্রহী হন। এই যেমন, এবার ঈদে অনেকে ইন্ডিয়ান কাতান শাড়ি না নিয়ে দেশি তান্তুজ শাড়ি নিয়েছেন। কারণ, এই শাড়ি দেখতে রুচিশীল। দামও হাতের নাগালে।’

এই উদ্যোক্তা মনে করেন অন্যান্য দেশি উদ্যোক্তারা যদি পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে গুণগত মানকে বেশি প্রাধান্য দেন তাহলে দেশীয় শাড়ি বা পোশাক, ভারতীয় পোশাকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে খুব সহজেই। 

আড্ডার এক পর্যায়ে অভিমানের স্বরে সচি বলেন, ‘আমার খুবই মন খারাপ হয় যখন দেখি কেউ বলে, ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসা করে টাকা ইনকাম করা যায়। ব্যাপারটা আসলে ভুল। কাজটা অনলাইনে হলেও পণ্যের কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে ডিজাইন এবং সব কাজ কারিগরকে বুঝিয়ে দিতে আমাদের ঘরের বাইরে বের হতেই হয়। দিনের একটি বড় অংশ আমার বাসার বাইরে কাজে থাকি। অনলাইন পণ্য বিক্রির একটি মাধ্যম কেবল। বাকি কাজগুলো ঘরের বাইরে গিয়েই করতে হয়।’

sochiএকজন ব্যবসায়ী হিসেবে ক্রেতাদের বেশ গুরুত্ব দেন সচি। নিজে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় অনেক শখের শাড়িই কিনতে পারেননি সাধ্যের মধ্যে না থাকায়। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই কুমুদিনীর বসনের বিভিন্ন পণ্যের দাম নির্ধারণ করেন। বিভিন্ন রেঞ্জের পোশাক থাকায় ক্রেতা নিজের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পোশাক কিনতে পারেন। শিক্ষার্থীদের জন্য রেখেছেন কিস্তির ব্যবস্থাও। শিক্ষার্থীরা চাইলে কিস্তিতে জামা-কাপড়ের দাম পরিশোধ করে পণ্য কিনতে পারবেন। এছাড়াও তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়ও। 

বর্তমানে পোশাক নিয়ে অনলাইনে অনেকেই কাজ করছেন। বিক্রেতা বাড়ায় কী ব্যবসা ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে? জানতে চাইলে সচি বলেন, ‘অনলাইন ব্যবসা করা ভালো কিন্তু সঠিক জ্ঞান না নিয়ে ব্যবসা শুরু করলে অনেকক্ষেত্রে সমস্যা হয়। কিছু বিক্রেতা কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না পেলে বিক্রির জন্য কেনা দামে পণ্য বিক্রি করেন। এতে চারপাশের সুস্থ প্রতিযোগিতায় অসুস্থতা দেখা দেয়। এমন ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ব্যবসা করতেও পারেন না। কিন্তু বাজারে খারাপ প্রভাব ফেলেন ঠিকই।’

তাই বলে যে একই পণ্য নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের বিপক্ষে তিনি-এমনটা নয়। নতুন উদ্যোক্তাদের সবসময় উৎসাহ দিয়ে এসেছেন সচি। তাদের পণ্য কিনেছেন। রিভিউ দিয়ে অন্যদের পণ্য ও উদ্যোক্তা সম্পর্কে জানিয়েছেন। সচি বলেন, ‘আমরা যখন ব্যবসা শুরু করেছিলাম তখন অন্যদের চেয়ে খুব একটা সাহায্য পাইনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে নতুনদের সাহায্য করার চেষ্টা করি। তারা যেন নিজেদের একা মনে না করে। প্রতিযোগিতা তো অবশ্যই থাকবে কিন্তু সহমর্মিতাও থাকা উচিত।’

sochiপ্রায় ৫ বছর ধরে ব্যবসা করছেন সচি। শুরুটা করেছিলেন একদম একা। পণ্য নির্বাচন থেকে শুরু করে বাছাই করা, অর্ডার নেওয়া, প্যাকিং করা সব সামলেছেন নিজ হাতে। বর্তমানে তার সঙ্গে কাজ করছেন আরও ১০-১২ জন নারী। যাদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউবা গৃহিনী। এসব নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সচি। কাজের পাশাপাশি তাদের সফট স্কিলেও দক্ষ করে তুলছেন। তারা যেন নিজেদের চাকরির বাজারের জন্য উপযুক্ত করে তুলতে পারেন, সেই চেষ্টা করছেন। তার মাধ্যমে নতুন করে কাজের ব্যবস্থা হয়েছে প্রান্তিক কিছু তাঁতিদেরও।  

একজন সফল উদ্যোক্তার অবশ্যই থাকা উচিত এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য কী হতে পারে? জানতে চাই সচির কাছে। তিনি বলেন, ‘সৎ, পরিশ্রমী এবং নিজের সঙ্গে নিজের প্রতিযোগিতার অভ্যাস।’ তিনি নিজেও এই তিনটি বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে ব্যবসা করছেন। দেশের পরিধি ছাড়িয়ে একসময় পৃথিবীর সব প্রান্তে কুমুদিনীর বসনের নাম ছড়িয়ে যাবে-এমন স্বপ্ন দেখেন এই নারী উদ্যোক্তা।

এনএম/এজেড