প্রকৃতি মানুষকে সবসময়ই কাছে টানে। আদিকাল থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান। কারো কাছে প্রিয় পাহাড়ের সবুজ মিতালি। কারো ভালো লাগে ঝর্ণার অপূর্ব সৌন্দর্য কিংবা সাগরের কলতান। যার কাছে যেটিই প্রিয় হোক না কেন ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য পছন্দের তালিকায় প্রথমেই ওঠে আসে সিলেটের নাম। তাই পূণ্যভূমি সিলেটকে বলা হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রাজধানী।
এবার সৌন্দর্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত দত্তরাইল গ্রামের চাঁন মিয়ার আনারস বাগান। এটি সিলেটের নতুন পর্যটন স্পট।
বিজ্ঞাপন
যেদিকে চোখ যাবে শুধু সবুজ আর সবুজ। এ যেন এক সবুজের সমারোহ। নীল আকাশের নিচে যেন সবুজ গালিচা পেতে সারিবদ্ধ ভাবে আছে হাজার হাজার আনারস গাছ। আছে উঁচু-নিচু টিলা আর টিলার মাঝে সুশৃঙ্খল ভাবে করা হয়েছে আনারস চাষাবাদ। সুউচ্চ টিলা গুলোর উপরে উঠার সরু সিড়ি পথ আর ছোট বড় কয়েকটি টিলাবেষ্টিত আনারস বাগান, এক টিলা থেকে অন্য টিলায় ছুটে চলার আঁকাবাঁকা মেঠোপথ আপনাকে অন্যরকম অনুভূতি দেবে।
আপনার যদি শহরের কোলাহল ছেড়ে নিরিবিলি দূরে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে করে, যান্ত্রিক কোলাহলমুক্ত পরিবেশে একান্ত সময় কাটাতে চান তাহলে এই বাগানটি পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রাখতে পারেন। কারণ প্রকৃতির সব সৌন্দর্যের সম্মিলন যেন এখানে ঘটেছে। দিগন্তজোড়া সবুজ টিলা গুলোতে আনারস গাছ, নীল আকাশের নিচে অপরূপ মায়াবি আভা এমন সব অন্তহীন সৌন্দর্য একাকার হয়ে আছে গোলাপগঞ্জের চাঁন মিয়ার আনারস বাগানে।
অল্পদিনের মধ্যে চাঁন মিয়ার আনারস বাগানের খ্যাতি অনেক। বাগান করার পূর্বেও টিলার এলাকার জন্য এই জনপদ প্রাকৃতিক ভাবে সুন্দর ও সমৃদ্ধ। বাগানটি করার পর তা আরও বেশি সমৃদ্ধ হয়। বিশেষ করে এবছর বাগানটিতে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ব্যাপক কাজ করেছে বাগান মালিক কর্তৃপক্ষ।
২০২২ সালের শুরু থেকে বাগানে সাধারণ দর্শনার্থী প্রবেশ বন্ধ রেখে নতুন রূপে সাজিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন থেকে আবারও দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বাগানে এবছর দর্শনার্থীদের জন্য নতুন ভাবে যুক্ত হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাসার স্থান, দর্শনার্থী বসার ছাউনি, সুউচ্চ টিলার চুড়ায় ক্যান্টিন, ছবি তোলার জন্য নিদিষ্ট স্থান ইত্যাদি।
বিজ্ঞাপন
অনেক ভ্রমণবিলাসী মানুষের কাছে আনন্দভ্রমণ কিংবা একটি সুন্দর বিকেল কাটানোর স্থান হিসেবে পছন্দের তালিকায় প্রথমে এ বাগান। সিলেট শহর থেকে গোলাপগঞ্জ উপজেলার দূরত্ব একেবারেই কম হওয়ায় চাঁন মিয়ার আনারস বাগান দেখতে অনেক পর্যটকেরা ছুটে যান সেখানে। মাঝে মধ্যে দর্শনার্থীর ভিড় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় বাগান কর্তৃপক্ষকে।
যে কারণে বিখ্যাত
সিলেটে সাধারণত জলঢুপি ও শ্রীমঙ্গলের আনারস জনপ্রিয়। তবে দত্তরাইলের চাঁন মিয়া আনারস বাগানের আনারসের কদর দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানের আনারস সুস্বাদু ও বড় আকৃতির হওয়ার কারণে আকার ভেদে আনারসের হালি ২ শ থেকে ৪ শ টাকায় বিক্রি হয়। এখানে যদি ভ্রমণে আসেন তাহলে এই বাগানের আনারস দিয়ে তৈরি টক-ঝাল-মিষ্টির স্বাদে আনারসের আচার কিংবা আনারসের জুস খেলে ভুলবেন না।
চাঁন মিয়া পাইনাপেল গার্ডেন
সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মতিন চাঁন মিয়ার ৮ পুত্র, বর্তমানে ৭টি টিলায় সবমিলিয়ে প্রায় ৭০ বিঘা ভূমিতে হানিকুইন আনারস চাষ করছেন। উঁচু-নিচু টিলা বিশিষ্ট এ-বাগানটির মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য মন কেড়েছে দর্শনার্থীদের। পরে ভ্রমণবিলাসী মানুষের জন্য বাগানটিতে সৌন্দর্য বর্ধনের ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করে দৃষ্টিনন্দন ভাবে সাজিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নাম বাংলা থেকে ইংরেজি করা হয়। সাইনবোর্ডে চাঁন মিয়া আনারস বাগানের নাম বদলে চাঁন পাইনাপেল গার্ডেন করা হয়। তবে, প্রথম কয়েকবছর বাগানে প্রবেশাধিকার বিনামূল্যে থাকলেও এবছর দর্শনার্থীদের জন্য ৩০টাকার টিকিট বাধ্যতামূলক।
আনারস বাগান যেভাবে পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠল
বাগানের মূল উদ্যোক্তা প্রবাসী রাসেল আহমদ বলেন, আমি প্রবাসী ছিলাম। আমি ২০১৮ সালে দেশে আসলে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ম্যানেজার রইছ উদ্দিন আমার বাড়িতে আসেন তার প্রাতিষ্ঠানিক কাজে। তিনি আমার বাড়ির টিলাগুলো দেখে আমাকে আনারস বাগান করার পরামর্শ দেন। পরে আমি সে বছর তার বাড়ি শ্রীমঙ্গলে তারই মালিকানাধীন কয়েকটি বাগান দেখতে যাই। সেখানের সারি সারি আনারস বাগানের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে। তবে আমি তাকে শর্ত দেই যে, যদি আপনি সঙ্গে থাকেন তাহলে আমি বাগান করবো। এতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন রইছ। পরে ভাইদের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ নেই বাগান সৃজনের।
উত্তরাধিকার সূত্রে বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক আবদুল মতিন চান মিয়ার ৮ ছেলে। প্রথমে বাড়ির পাশে ৬টি টিলার ৬০ বিঘা জায়গা নিয়ে শুরু হয় আনারস লাগানোর কাজ। শ্রীমঙ্গল থেকে রইছ উদ্দিন সরবরাহ করেন চারা। একে একে টিলাগুলো আচ্ছাদিত হতে থাকে আনারস গাছে। এভাবেই শুরু হয় বাণিজ্যিক ভাবে আনারস বাগানের যাত্রা। পরে দেখলাম বাগানের সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করেছে এবং হাজারো দর্শনার্থীর ভিড় করছেন প্রতিদিন। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা দেখতে আসেন বাগানটি। পরে আমরা বাগানটির সৌন্দর্য বর্ধন করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্রের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছি।
বাগান নিয়ে পরিকল্পনা
চাঁন মিয়া আনারস বাগান প্রথমে বাণিজ্যিক ভাবে গড়ে তোলা হলেও মানুষের কাছে এটি অল্প সময়ে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। তাই বাগানের মালিক পক্ষ থেকেও একটি আদর্শ পর্যটন কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার নানা পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বাগানের অন্যতম পরিচালক রইছ উদ্দিন বলেন, এবছর বাগানের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য ব্যাপক কাজ হয়েছে এবং আমাদের আগামীর পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সুন্দর রূপরেখার মাধ্যমে বাগানটিকে ঘিরে একটি ভালো মানের রিসোর্ট নির্মাণের। যেখানে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে রাত্রিযাপন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে সময় কাটাতে করতে পারেন।
তিনি জানান, বাগানের ভেতরে একটি প্লেগ্রাউন্ড নির্মাণ করারও পরিকল্পনা আছে তাদের।
যেভাবে যাবেন চাঁন মিয়া আনারস বাগানে
রাজধানী থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে সিলেট মহানগরীতে যাওয়া যায়। সায়েদাবাদ-ফকিরাপুল থেকে দূরপাল্লার বাসে সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় অবস্থিত কদমতলী যেতে খরচ পড়ে জনপ্রতি প্রায় ৫৭০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। কদমতলী যাওয়ার পর যে কারো কাছে জানতে চাইলে দেখিয়ে দিবে গোলাপগঞ্জে যাওয়ার জন্য গাড়িতে ওঠার স্থান। পায়ে হেঁটে দূরত্ব বেশি হলে ১ মিনিটের। সেখান থেকে গোলাপগঞ্জগামী সিএনজি অটোরিকশা কিংবা বাসে করে চলে যাবেন গোলাপগঞ্জ চৌমুহনীতে। সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৩০ টাকা। চৌমুহনী থেকে একটি একটি সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করে চলে যান আব্দুল মতিন চাঁন মিয়া আনারস বাগানে। সময় লাগবে প্রায় ১০ মিনিটের মত। সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ ভাড়া নিবে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১২০ টাকা ।
এজেড




