রোববার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

বাবাকে মনে পড়ে

মো. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশিত: ১৮ জুন ২০২৩, ০৬:৩৭ পিএম

শেয়ার করুন:

বাবাকে মনে পড়ে

সুদূর আফগান মুলুকের কাবুলিওয়ালা হোক, কিংবা হোক মিনির বাঙালী লেখক বাবা। পোশাকে আশাকে থাকতে পারে আকাশ পাতাল তফাত, তফাত থাকতে পারে অর্থবিত্তে, খাদ্যাভ্যাসে। এক জায়গায় তাদের অন্তমিল; তারা দুজনেই বাবা। এই পরিচয়ই অক্ষয়, সার্বজনীন।

এবার আমার বাবার বলছি। সেই শৈশবের কথা। আমাদের বাড়ীর সামনের ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তা দিয়ে বিকেলে নিয়মিত হাঁটতেন তিনি; আমি তার কোলে। কখনো কখনো পূর্ণিমার রাতে হাঁটতে বেরোতেন। আমিও গুটি গুটি পায়ে তার পিছু নিতাম। প্রথম প্রথম না করলেও পরে এসে হাত ধরতেন। খেয়াল করতেন গর্তে যেন না পড়ি। পৃথিবীর প্রত্যেক বাবাই তার সন্তানদের রাহবার। বাবাও ছিলেন তেমনি।

একটু বড় হওয়ার পর আমার উপর বাবার ভরসা বাড়লো। আমরা বছরে অন্ততঃ একবার ঢাকায় বেড়াতে আসতাম। সেসময়ে ঢাকার সাথে মফস্বলের যাতায়াতের পথ ছিলো বন্ধুর। বাবার পছন্দের যান ছিলো নোয়াখালী এক্সপ্রেস। রাতের ট্রেনটি ফজরের সময়ে সোনাইমুড়ী পৌঁছাতো। সেখানে নেমে কুলির কাছে বাক্স পেটরা তুলে দিতেন। কুলি মালামাল মাথায় নিয়ে উল্কা বেগে ছুটতো। তার আশা যদি ফেরত এসে আরেকজন যাত্রীর মুট মিলে যায়। বাবা তখন একদিকে কুলির পেছনে পেছনে ছুটতেন, অন্যদিকে আমরা পিছিয়ে পড়ছি কিনা সেদিকে থাকতেন সমান সজাগ।

আমাদের চলাফেরার ব্যাপারে বাবা আজকালকার পিতামাতাদের মতো হেলিকপ্টার প্যারেন্ট ছিলেন না। কতবার ফুটবল খেলতে গিয়ে পা ছিলে গেছে, বন্ধুদের সাথে মারামারি করে হাতে ব্যথা পেয়েছি। এগুলো নিয়ে কখনো তার মাথাব্যথা দেখিনি। আমাদের লেখাপড়ার বিষয়টি মা আর ইসমাইল স্যারের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। অবশ্য আমার দুরন্তপনা সীমা ছাড়িয়ে গেলে বেত হাতে দৃশ্যপটে তার আগমন ঘটতো। তাও স্বেচ্ছায় নয়। মায়ের রিকুইজিশনের অপেক্ষা করতেন।

আমার বাবা ছিলেন আমার ক্লাসরুমের সরাসরি শিক্ষক। নবম শ্রেণীতে আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। ইতিহাস ছিলো তার প্রিয় পাঠ্য বিষয়। বিজ্ঞান/বাণিজ্যের ছাত্র ছিলাম বলে ইতিহাসের কোন পাঠ্যপুস্তক পড়ার সুযোগ আমি পাইনি। গল্পচ্ছলে ইতিহাস বলতেন। মুঘল ও ইউরোপীয় ইতিহাস ছিলো তার পছন্দের এলাকা।এই গল্প বলা থেকেই থেকেই তিনি আমার মাঝে ইতিহাস, ঐতিহ্য পড়ার উৎসাহ উসকে দিয়েছিলেন। লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর অনুরাগী ছিলেন তিনি। তার প্রায় সবগুলো লেখা বাবার সংগ্রহে ছিলো। শরৎ চন্দ্রের বিপ্রদাস, শুভদা, বড় দিদি, মেজদিদি; বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম, এই বইগুলো বারবার পড়তেন। শরৎচন্দ্রের পথের দাবী উপন্য্যাসটি ছিলো তার খুবই প্রিয়। আমাদের কোন বই পড়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতেননা। তবে একবার পথের দাবী উপন্যাসটি পড়ে দেখতে বলেছিলেন।

মিষ্টি ছিলো তার খুব পছন্দের। ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর তার খাবার দাবারের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করা হলো। তবে বাবা রণে ভঙ্গ দেবার পাত্র ছিলেননা। তিনি চৌমুহনী যাবার সূযোগ পেলেই সেখানকার শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের লুচি, দই, রসগোল্লা নিয়ে বসে পড়তেন। আমি বাড়ীতে গিয়ে মাকে কিছু জানাবো না, এটি বললে তিনি আশ্বস্ত হয়ে আরো রসগোল্লার হুকুম দিতেন। 

গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষদের মতো অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি।তবুও তিনি ছিলেন তার সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ। তার উপর আমার মাঝে মাঝে ঈর্ষা হয়। নিজের বাবা বলে বলছিনা; আমাদের এলাকার ছোটো বড় নির্বিশেষে সবার কাছ থেকে তিনি যেমন শ্রদ্ধা, ভালবাসা পেয়েছেন, এমন উদাহরণ খুব বেশী দেখিনি। অথচ তিনি ছিলেন একজন স্রেফ হাইস্কুলের হেডমাস্টার। না ছিলো অঢেল ধনসম্পদ, না ছিলো রাজনৈতিক ক্ষমতা।

খ্যাতিমান হবার সূযোগ ছিলো তার। তিনি ছিলেন দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নোয়াখালী জিলা স্কুল, ঢাকা কলেজ, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। তার সহপাঠীদের কেউ কেউ হয়েছেন বড় আমলা, রাজনীতিক, মন্ত্রী। তিনি কিন্তু সবসময় পাদপ্রদীপের আলোর পেছনে থাকতেই পছন্দ করতেন। এ নিয়ে তাকে দু একবার প্রশ্ন করেছি তাকে। উত্তর দেবার উৎসাহ দেখাননি। ইউরোপীয় ইতিহাস পড়া ছিলো তার।একবার তিনি ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরী দুর্ভাগা স্ত্রীদের পরিণতির কথা বলছিলেন। হয়তো ভেবেছেন, এমন সেলিব্রেটি জীবনের চেয়ে অন্তঃপুরের জীবন ঢের ভালো। বাবা দিবসে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক উপাচার্য, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

এনএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর