ডিজিটাল যুগ। স্মার্টফোন সবার হাতে হাতে। প্রায় প্রত্যেকেই মোবাইলে তাদের পছন্দের ভিডিও দেখে। আমিও দেখি। সাগরে জাহাজ চলা, ঢেউয়ের মোকাবেলা করে উত্তাল জলরাশিতে ডিঙি নৌকার টিকে থাকা দেখতে ভালো লাগে। একটা ভিডিওর পর আবার একই রকম আরেকটা ভিডিও আসলেও দেখি। এই ভালো লাগার কোনো কারণ জানা নেই।
বিশাল ঢেউকে এসব নৌযানগুলো সরাসরি মোকাবেলা করে অথবা ঢেউয়ের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেয়। এতে ঢেউ যত বড়ই হোক না কেন নৌকার কোনো ক্ষতি হয় না। বেঁচে যায় এর ওপর থাকা মানুষগুলোও। কিন্তু হাজার হাজার ঢেউয়ের কোনো একটা ঢেউও যদি সঠিকভাবে মোকাবেলা করা না যায়, তাহলে এর পরিণতি সহজেই অনুমেয়। তা হলো নৌকা ও এর সওয়ারীদের সলিল সমাধি।
আব্বু। স্বল্পশিক্ষিত কৃষক। কিশোর বয়স থেকেই ধরেছেন সংসারের হাল। ভাই-বোনদের সঙ্গে নিয়ে ও পরে নিজের সংসারের হাল ঠিক করতে কখনো নিজের আবার কখনো পরের জমিতে শ্রম দিয়ে পেরিয়েছেন এতটা পথ। পৃথিবীটা যদি সমুদ্র হয়, গোটা জীবনটা তাহলে একটি ডিঙি নৌকা। আর সেই নৌকার অত্যন্ত দক্ষ মাঝি আমার আব্বু। তিনি এতটাই দক্ষ যে, জীবনের একটি ঢেউও পরাজিত করতে পারেনি তাকে।
তিনি যে পরাজিত হননি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমরা। একবারের জন্যও পরাজিত হলে আমাদের সলিল সমাধি হতো নিশ্চিত। হয়তো বখাটে হতাম, না হয় মাদকের জালে আটকা পড়তাম বা কোনোরকমে শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতাম। গ্রামের অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই এমন ঘটে।
নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার অনেকটা তীব্র ভাটা বা জোয়ারে উল্টো দিকে বওয়া নৌকার মতো। যেখানে সমস্ত শক্তি দিয়ে বৈঠা চালালেও তিন হাত সামনে গিয়ে দুই হাত পিছিয়ে আসে। তারপরও শক্তির সর্বোচ্চ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা থাকে। এই গন্তব্য খুবই সামান্য। হয়তো তিন বেলা মোটামুটি খাবার, পরার মতো একটু কাপড় আর টিকে থাকা।
অবস্থা যাই থাকুক আব্বু আমাদের কখনো অভাবে রাখেননি। আমার পেট কখনো খালি থাকেনি। ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা কখনও অনুভব করিনি। জীবনে যখন যেটুকু দরকার সেটুকু করতে কখনও পিছপা হননি। সাধ্যের মধ্যে নয়, সাধ্যের অনেক বাইরে গিয়েও তিনি করেছেন, এখনও করেন।
ছোটবেলায় সপ্তাহে বুধবার বা শনিবারের হাটে গেলে কাঁচাবাজারের কোনায় থাকা মিষ্টির দোকান থেকে ছানা জিলাপি কিনে খাওয়াতেন আব্বু। আমার মনে আছে আব্বু সব সময় বলতেন- আমি খাবো না, তুমি খাও। প্রতি হাটে অল্প-বেশি যে টাকারই ফসল বিক্রি করতেন না কেন। দিনশেষে তার পকেট শূন্য। সবার জন্য, সংসারের জন্য এটা ওটা কিনতে গিয়ে অবশিষ্ট আর কিছুই থাকত না।
নতুন ক্লাসে উঠলে নতুন ড্রেস, একটু পুরনো হয়ে গেলে নতুন জুতা। যতটুকু সম্ভব কিনে দিয়েছেন। এসব নিয়ে জীবনে কখনও অভিযোগ-অনুযোগও করিনি। আমার মনে পড়ে না আমি কখনও বলেছি যে, ওমকের এটা আছে আমার এটা লাগবে। কারণ এটা বলার দরকার হয়নি। আমার প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট আমি পেয়েছি।
সপ্তাহখানেক পরে ঈদ। বরাবরের মতোই আম্মুকে জিজ্ঞাসা করেছি আপনাদের কী লাগবে। খুব সহজ ভঙ্গিতে এবং দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, সবই তো নতুন আছে। কিছু লাগবে না। বাবা-মায়েদের পোশাক-পরিচ্ছদ হয়ত কখনও পুরনো হয় না। তাদের কষ্ট হয়তো এখনও কমেনি। তারপরও তাদের মুখের হাসি আমাকে আহ্লাদিত করে।
এখন আমি বাবা হয়েছি। কিছুটা নয়, অনেকটাই বুঝি। বাবার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের বাবাকেও প্রতিক্ষণ মনে পড়ে। একেবারে অজপাড়া গাঁয়ে থাকার পরও আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন সততার, দায়িত্বশীলতার, মানুষ হওয়ার। গ্রামের আর দশজনের মতো না হয়ে সন্তানকে সর্বোচ্চ শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এটুকু জীবনে অনেক শিক্ষক ও মহান মানুষদের কথা শুনেছি। কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা আমার স্বল্পশিক্ষিত আব্বু যেভাবে দিয়েছেন সেটিই গেঁথে আছে মনে।
অন্য অনেকের মতো আমারও আম্মুকে বা আব্বুকে কখনও বলা হয়নি যে তাদের কত ভালোবাসি। হয়তো কখনও বলাও হবে না। তবে সৎ সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই। যতদিন আল্লাহ তৌফিক দেন জীবনের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে আব্বুর জন্য করতে চাই। আম্মুর জন্য করতে চাই। আমার কাজ চেষ্টা করা। সেটিই করছি। নিশ্চয় চেষ্টা করলে মহামহিম রব নিরাশ করবেন না।
একে




