‘মামলা খেয়ে ফেলছি, কী করবি’

প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর ২০২২, ০৮:২৮ এএম
‘মামলা খেয়ে ফেলছি, কী করবি’

এক কিশোরীকে ফুসলিয়ে নিয়ে ধর্ষণ। ঘটনা গোপন রাখতে হাজারো চেষ্টা। পরে ওই কিশোরীকে পাগল সাজানোর গল্প। এর সঙ্গে আসামি ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি তো আছেই। অন্যদিকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে একের পর এক হুমকি দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তার। গা শিউরে ওঠার মতো এই ঘটনার আসামিকে অব্যাহতি দেয় জেলা আদালত।

এরপর নীলফামারির প্রত্যন্ত গ্রামের সেই কিশোরী মাকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি হাজির হন হাইকোর্টে। হাইকোর্টের এজলাসে দাঁড়িয়ে তার অবর্ণনীয় কষ্টের কথা শোনান। বিচারপতি তার কথা শুনে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দেন। পরে কিশোরীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সরকারি আইনি সহায়তা কেন্দ্র লিগ্যাল এইডে। হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে অবশেষে বিভাগীয় বিচারের মুখোমুখী হচ্ছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে কিশোরীর চাচা ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রতিপক্ষ এখনও ভয়ভীতির পাশাপাশি অনবরত হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তো শুরু থেকেই হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন।

কিশোরীর চাচা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ওরা আমাদেরকে না জানিয়ে আমার ভাতিজিকে নিয়ে গেছে। বিজিবি সদস্য আকতারুজ্জামান বাইসাইকেলযোগে তাকে নিয়ে যায় নীলফামারীর সাজেদা ক্লিনিকে। ওখানে একরাত ছিল। পরদিন রাত দশটা-এগারোটার দিকে তাকে নিয়ে আসে। এরপরই মেয়েটা অসুস্থ হয়ে যায়, ভারসাম্যহীন হয়ে যায়। আমরা কোনো কিছু বলতে গেলে ওরা বলে মেয়েটা পাগল। লেখাপড়া করতে করতে পাগল হয়ে গেছে। আমাদেরকে তারা এখনও হুমকি দেয়। অভিযুক্ত আকতারুজ্জামানের মা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আকতারুজ্জামানরা আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে ড্যান্স দেয়। বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে আর বলে, মামলা খেয়ে ফেলছি, কি করবি।

এ মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা আপনাদের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেছে কী না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি তাকে বলছিলাম আমরা গরিব মানুষ। ভালো তদন্ত করে রিপোর্ট দেন। তখন ওই তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে হুমকি দিয়েছে বলেন, বেশি কথা বললে তোমার অসুবিধা হবে। আমি থানায় গিয়ে ভালো করে তদন্তের কথাটা বলেছি ওনাকে। তারপরে সে এই রকম হুমকি দিয়েছে।

এদিকে ওই কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনার মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অধিকতর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) এই রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। এছাড়াও অভিযুক্ত বিজিবি সদস্য আকতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

গত সোমবার (২১ নভেম্বর) বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি ড. বশির উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। কিশোরীর পক্ষে লিগ্যাল এইড নিযুক্ত আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ঢাকা মেইলকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে গত ২৯ জুন চার সপ্তাহের মধ্যে অভিযুক্ত বিজিবি সদস্যকে নীলফামারীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে বলেছিলেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির জন্যও গ্রহণ করেন। তার আগে ২৬ জুন ভুক্তভোগী কিশোরীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় লিগ্যাল এইডের প্যানেল আইনজীবী বদরুন নাহার এই আবেদন করেন।

এছাড়া বিজিবি সদস্য আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর মামলাটি করেছিলেন নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ভুক্তভোগী সেই কিশোরীর মা। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর বিকেলে সৈয়দপুর শহরের সাজেদা ক্লিনিকে জন্ম নেওয়া বোনের নবজাতককে দেখানোর কথা বলে বিজিবি সদস্য আক্তারুজ্জামান প্রতিবেশী ওই কিশোরীকে মোটরসাইকেলে করে শহরে নিয়ে যায়। বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়েই সে ওই কিশোরীকে নিয়ে যায়। এরপর সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভুক্তভোগী কিশোরীর বড় বোন তার মাকে জানায়, আক্তারুজ্জামানের বোন তাকে জানিয়েছে (ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে) তার ছোটো বোন আজ ফিরবে না।

পরদিন সকাল ৮টায় আক্তারুজ্জামানের বোন কিশোরীর জন্য জামা নিতে তাদের বাড়িতে আসে। সে সময় আক্তারুজ্জামানের বোন জানায়, মাংসের ঝোল লাগায় কিশোরীর আগের দিন গায়ে থাকা জামা ধুয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কথা বলে কিশোরীর ঘর থেকে তার আরেকটি জামা নিয়ে যায় আক্তারুজ্জামানের বোন। এরপর রাতে আক্তারুজ্জামান মোটরসাইকেলে করে কিশোরীকে তার বাড়িতে রেখে যায়।

বাড়িতে রেখে যাওয়ার পর মেয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকায় পরদিন ১১ নভেম্বর তার মা তাকে স্থানীয় হুজুরের কাছে নিয়ে ঝাড়ফুঁক করান। এতেও মেয়ে সুস্থ না হওয়ায় ১২ নভেম্বর সকালে ভুক্তভোগী কিশোরীকে নীলফামারীর আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদিনই মেয়েটিকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) স্থানান্তর করা হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের ছাড়পত্রে ‘যৌন নিপীড়নের’ কথা উল্লেখ করা হয়। পরে এই ঘটনায় কিশোরীর মা ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর মামলা করেন।

সেই মামলার তদন্তের পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়ে নীলফামারীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গত ১৭ মে আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।

এরপর সেই কিশোরী বিচার পেতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। গত ১৫ জুন ভুক্তভোগী কিশোরী আদালতে উপস্থিত হয়ে বলেন, আমরা গরিব মানুষ, টাকা-পয়সা নাই। আমি ধর্ষণের শিকার, আমি বিচার চাই।

আদালত তাদের পরিচয় জানতে চান। জিজ্ঞেস করেন, আপনারা কারা, কি হয়েছে? আপনি কে? আপনার সঙ্গে উনি কে? জবাবে ভুক্তভোগী কিশোরী বলেন, আমার বয়স ১৫ বছর। উনি আমার মা। আমি ধর্ষণের শিকার। একজন বিজিবি সদস্য আমাকে ধর্ষণ করেছে। কিন্তু নীলফামারীর আদালত তাকে খালাস দিয়ে দিয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের টাকা-পয়সা নাই। আমরা আপনার কাছে বিচার চাই।

পরবর্তীকালে আদালত ওই কিশোরীর কাছে জানতে চান, তার কাছে কোনো কাগজপত্র আছে কি-না। কিশোরী কাগজ আছে বললে আদালত উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, এখানে লিগ্যাল এইডের কোনো আইনজীবী আছেন? একজন আইনজীবী দাঁড়ালে আদালত তাকে এই কিশোরীর মামলাটি সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে নিতে নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে এবং জরুরিভিত্তিতে দেখতে বলেন।

এরপর লিগ্যাল এইড কিশোরীর পক্ষে আইনি সহায়তা দেয়। আদালতে তারা কয়েকবার শুনানি করেন। শুনানি শেষে এ মামলার অভিযুক্ত বিজিবি সদস্য আক্তারুজ্জামানকে দেওয়া অব্যাহতির আদেশ বাতিল করেন। আগের তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এখন এ ব্যাপারে অধিকতর প্রতিবেদন হাইকোর্টে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা।

এআইএম/জেএম/এএস