বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

মন্ত্রীদের পিএস-এপিএস পদে বিচারকদের পদায়ন কেন অবৈধ নয়: হাইকোর্টের রুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

মন্ত্রীদের পিএস-এপিএস পদে বিচারকদের পদায়ন কেন অবৈধ নয়: হাইকোর্টের রুল
হাইকোর্ট।

অধস্তন আদালতের বিচারকদের প্রেষণে (ডেপুটেশন) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) ও সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দেওয়া নিয়োগ কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের সাংবিধানিক রূপরেখা ও আপিল বিভাগের ‘মাসদার হোসেন’ মামলার নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিচারকদের নির্বাহী কার্যালয়ে পদায়ন করা থেকে বিরত থাকার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিচারপতি মোহাম্মদ তৌফিক ইনাম ও বিচারপতি মাহমুদ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে এই রুল জারি করেন।

তবে প্রেষণে নিযুক্ত ওই বিচারকদের দায়িত্ব পালনে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ (স্টে) দেননি আদালত। ফলে তারা নিজ নিজ পদে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে পারবেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস ও ব্যারিস্টার মিয়া মোহাম্মদ ইশতিয়াক। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

এর আগে, গত ২১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. রশীদুল হক খোকন জনস্বার্থে এ রিট আবেদনটি দায়ের করেন। 

রিটে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।

‘সংবিধানে নির্বাহী থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে’

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) পদে একজন যুগ্ম জেলা জজকে এবং একইভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দুজন বিচারিক কর্মকর্তাকে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।

রিটে ওই তিনটি পৃথক প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করা হয়। 

একই সঙ্গে ‘জুডিশিয়াল সার্ভিস গঠন বিধিমালা, ২০২৫’ এবং আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক ‘সেক্রেটারি, অর্থ মন্ত্রণালয় বনাম মাসদার হোসেন ও অন্যান্য মামলার রায়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উপায়ে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের ভবিষ্যতে নির্বাহী কার্যালয়ে পদায়ন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও রিটে জানতে চাওয়া হয়েছিল।

শুনানি শেষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া ১৯৯৯ সালের ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার নির্দেশনায় বলা হয়েছিল—বিচার বিভাগের কোনো কর্মকর্তাকে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করা যাবে না।’

তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘জুডিশিয়াল সার্ভিস বিধিমালা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট তপসিলে স্পষ্ট উল্লেখ আছে বিচারকরা কোন কোন পদে প্রেষণে যেতে পারবেন। বিচারকরা কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে আজ্ঞাবাহী কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে পারেন না। একজন মন্ত্রীর পিএস বা এপিএসের দায়িত্ব কোনো বিচারিক বা আধা-বিচারিক (কোয়াসি-জুডিশিয়াল) কাজ নয়। এই ধরনের প্রেষণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের ২২, ৯৪ ও ১১৬(ক) অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন।’

আইনজীবী আরও উল্লেখ করেন, ‘আইন মন্ত্রণালয়ে বিচারকদের পদায়ন নিয়ে ‘আফতাব উদ্দিন’ মামলায় আপিল বিভাগের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সাধারণ কোনো নির্বাহী মন্ত্রণালয়ে বা রাজনৈতিক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে তাদের নেওয়ার কোনো আইনি অবকাশ নেই।’

সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমেই নিয়োগ: অ্যাটর্নি জেনারেল

রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান ব্যাখ্যা করে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিটকারী পক্ষ দাবি করেছে যে মন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস পদে বিচারকদের পদায়ন মাসদার হোসেন মামলার মূল স্পিরিট ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী। তবে আইন ও প্রযোজ্য সরকারি বিধিমালায় বিচারকদের কিছু প্রশাসনিক পদে প্রেষণে পদায়নের সুযোগ রয়েছে।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, প্রধান বিচারপতির পিএস, আইন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদ কিংবা সলিসিটার কার্যালয়ে নিয়মিতভাবেই বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। বিধিমালায় প্রশাসনিক প্রয়োজনে অনূর্ধ্ব ১০ শতাংশ বিচারিক কর্মকর্তাকে এ ধরনের পদে বদলি বা পদায়নের বিধান রয়েছে।’

তিনি দাবি, ‘এসব পদায়ন কোনো মন্ত্রীর একক অভিপ্রায়ে হয়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত আদেশে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, সংবিধানের বিধান মেনে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমেই এ নিয়োগগুলো দেওয়া হয়েছে। ফলে সুপ্রিম কোর্টের প্রাতিষ্ঠানিক মতামত এখানে নেওয়া হয়েছে।’

অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, ‘যেহেতু বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত, তাই আদালত রুল ইস্যু করেছেন। তবে আদালত কোনো স্থগিতাদেশ দেননি; ফলে বিচারক কর্মকর্তারা তাদের বর্তমান পদেই বহাল থাকছেন।’

আরএনবি/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর