বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ইবিএলের সাবেক চেয়ারম্যানের শেয়ার বাজেয়াপ্ত কেন নয়, হাইকোর্টের রুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ইবিএলের সাবেক চেয়ারম্যানের শেয়ার বাজেয়াপ্ত কেন নয়, হাইকোর্টের রুল
ইবিএলের সাবেক চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে নামে-বেনামে ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার পরও ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) সাবেক চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের ধারণ করা ১০ শতাংশের অতিরিক্ত শেয়ার বাজেয়াপ্ত করার কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনায় শওকত আলী চৌধুরীর অতিরিক্ত শেয়ার ধারণ-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনটি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রিট আবেদনকারীর দায়ের করা আবেদনটি ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিচারপতি মো. শওকত আলী চৌধুরী ও বিচারপতি আব্দুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান এবং বিপ্লব কুমার দাশ।

এর আগে ব্যাংকিং খাত এবং শেয়ারবাজারের আমানতকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে জনস্বার্থে রিট পিটিশনটি দায়ের করেন ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং ইবিএলের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার আইনজীবী কামরুল ইসলাম।

রিটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর (ব্যাংক সুপারভিশন), ডেপুটি গভর্নর (বিআরপিডি), বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশন ডিরেক্টর (ডিপার্টমেন্ট-৯), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ পিএলসির (সিডিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এবং সাবেক চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীসহ ৯ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিট আবেদনে বলা হয়, কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত শেয়ার ধারণের বিরুদ্ধে ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ব্যবস্থা না নেওয়া কর্তৃপক্ষের অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও যোগসাজশমূলক আচরণ।

আদেশের পর রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ইশরাত হাসান ঢাকা মেইলকে জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। অথচ রেসপনডেন্ট শওকত আলী চৌধুরী নিজের ও তাঁর আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন।

তাঁর দাবি, একাধিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি তদন্ত পরিচালনা করে। ২০২৬ সালের ২৯ মার্চের তদন্ত প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত হয় যে, শওকত আলী চৌধুরী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মোট ২০.৪৮ শতাংশ শেয়ার ধারণ করে আছেন।

আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, "আশ্চর্যের বিষয় হলো, অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের একজন শেয়ারহোল্ডার হিসেবে পিটিশনার গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই আবেদনটিও নিষ্পত্তি করেনি। যার ধারাবাহিকতায় সংক্ষুব্ধ হয়ে এই রিট দায়ের করা হয়।"

রিট আবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়, তদন্ত ধামাচাপা দিতে এবং শেয়ার বাজেয়াপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে শওকত আলী চক্র বাজারে দ্রুত বেনামি শেয়ারগুলো বিক্রি করে ‘সেফ এক্সিট’ নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যেখানে সুশাসন নীতিমালা অনুযায়ী আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির দায়ে সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও তাঁর পরিবারকে আর্থিক খাত থেকে ন্যূনতম তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ (Debarred) করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দেওয়া অভিযোগে অন্যান্য গুরুতর অনিয়ম

এর আগে আইনজীবী কামরুল ইসলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের কাছে শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংক দখল ও আর্থিক জালিয়াতির বিশদ বিবরণ তুলে ধরে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে যেসব তথ্য উঠে আসে:

পারিবারিক ও বেনামি শেয়ারহোল্ডিংয়ের জাল: শওকত আলী ও তাঁর স্ত্রী তাশমিয়া আম্বারিন, কন্যা জারা নামরিন ও সাবাহ সামরিনের মালিকানাধীন নামরিন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, নামরিন পাওয়ার লিমিটেড, জেডএস হোল্ডিং লিমিটেড এবং জেড.এন. এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের মাধ্যমে সরাসরি ৯.৯৯% শেয়ার ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে আরুশা অ্যান্ড কোং (৯.৯৮%) এবং অনিকা শেয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজ (১.১৪%)-এর মাধ্যমে শেয়ার ধারণ করে ব্যাংকের মোট শেয়ারের ২১ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

মূলধনের চরম অসামঞ্জস্য ও অস্বাভাবিক শেয়ার হস্তান্তর

২০০১ সালে মাত্র ১ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে নিবন্ধিত আরুশা অ্যান্ড কোং প্রতিষ্ঠার পরপরই ৬ কোটি ৭১ লাখ টাকার শেয়ার কেনে। প্রতিষ্ঠানটির ৯৫% শেয়ারের মালিক দেখানো কর্মচারী নইমুল হকের সর্বশেষ আয়কর নথিতে মোট নিট সম্পদ দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা, যা দিয়ে ২০০২ সালে প্রায় পৌনে ৭ কোটি টাকার শেয়ার কেনা অসম্ভব। এ ছাড়া শ্যালিকা অনিকা তাহজীবের ৫% শেয়ার বিভিন্ন সময়ে কর্মচারী নইমুলের স্ত্রী ও পরবর্তীতে শওকত আলীর কন্যা জারা নামরিনের নামে নামমাত্র মূল্যে হস্তান্তর করা হয়, যার তৎকালীন প্রকৃত অন্তর্নিহিত মূল্য ছিল কয়েক কোটি টাকা।

ন্যাশনাল টি কোম্পানির প্লেসমেন্ট জালিয়াতি: ২০২৪ সালে আরুশা অ্যান্ড কোং ন্যাশনাল টি কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ে প্রায় ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে। যেখানে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারমূল্য প্রায় ৭৫০ টাকা থাকা সত্ত্বেও শওকত আলীর দুই সন্তানের নামে মাত্র ১১৯ টাকা দরে বড় অঙ্কের প্লেসমেন্ট শেয়ার বরাদ্দ নিয়ে সরকারের শেয়ার ৪১% থেকে ১৬.৫%-এ নামিয়ে আনার অভিযোগ রয়েছে।

অবৈধ ঋণ সুবিধার বিনিময়ে শেয়ার গ্রহণ: অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ক্লায়েন্টদের ‘মার্জিনাল রেটিং’ উপেক্ষা করে চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের মালিকানাধীন ‘স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্স লিমিটেড’ (SFL)-কে ৩৯০ কোটি টাকার (৩২.৫ মিলিয়ন ডলার) ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে বাধ্য করেন শওকত আলী। এর বিনিময়ে ১৫ কোটি টাকার সুরক্ষিত জমি বন্ধক বাতিল করে কমিশন ০.২৫% থেকে ০.১৫%-এ নামিয়ে দেওয়া হয়। সুবিধা হিসেবে সহযোগী প্রতিষ্ঠান 'CdNet Communications Ltd'-এর ৩ লাখ শেয়ার শওকত আলী ও তাঁর পুত্র জারান আলীর নামে স্থানান্তর করিয়ে নিয়ে পরিচালনা পর্ষদে স্থান নেন এবং 'Frontier Towers'-এ নিজেদের প্রক্সি পরিচালক বসিয়ে ব্যাংকের তহবিল বের করে নেন।

শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধার গাড়ির অপব্যবহার

২০১৬ সালে এঅ্যান্ডবি আউটারওয়্যার লিমিটেডের নামে ইপিজেডের বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা বিলাসবহুল 'মার্সিডিজ-বেঞ্জ AMG G63' গাড়ি কারখানায় ব্যবহার না করে শওকত আলীর পরিবার ও তাঁর পুত্রের ব্যক্তিগত বাহন হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়। গাড়িটি দীর্ঘদিন ভুয়া নম্বর প্লেটে চালানো হয়েছিল এবং ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর যৌথবাহিনী তা জব্দ করে।

খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখানো ও প্রক্সি প্রতিষ্ঠান: ৯৯ কোটি টাকা খেলাপি থাকা 'Multi Safh Bags Ltd'-এর বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে অ্যাকাউন্টটি কৃত্রিমভাবে নিয়মিত দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শওকত আলীর আস্থাভাজনদের হাত ঘুরে মূলত তাঁর নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হচ্ছিল।

পলাতক আসামির সিঙ্গাপুরের ঠিকানা ব্যবহার: সিলভিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ইবিএলের প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার পলাতক ঋণখেলাপি মুজিবুর রহমান মিলনের সিঙ্গাপুরস্থ ঠিকানার সঙ্গে শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী তাশমিয়া আম্বারিনের ব্যক্তিগত সম্পত্তির নথিপত্রে উল্লেখিত ঠিকানার হুবহু মিল রয়েছে।

দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন

শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন রেখে ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকা এবং শেল কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের শক্তিশালী কমিটি গঠন, জরুরি ভিত্তিতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ইবিএলের আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আদালতের আদেশের মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হলো।

আরএনবি/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর