দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক হিসেবে মোহাম্মদ ফজলুল হকের দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তী নির্বাচনের আয়োজনে কোনো আইনি বাধা নেই।
একই সঙ্গে বারবার মামলা করে আদালতকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে রিটকারী আলাউদ্দিন আল মাসুমকে আগামী ১৬ নভেম্বর সশরীরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এসব তথ্য জানান অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। চার মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হাইকোর্টের দেওয়া একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত স্থগিত করায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
এর আগে গত ২৬ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ফজলুল হককে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আলাউদ্দিন আল মাসুম নামের এক ব্যক্তি হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন।
ওই রিটের শুনানি নিয়ে গত ১৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ এক অন্তর্বর্তী আদেশে ফজলুল হককে চার মাসের মধ্যে নির্বাচন করার নির্দেশ দেন। এতে ব্যর্থ হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেলকে (ডিজি) এফবিসিসিআইয়ের দায়িত্ব নিয়ে পরবর্তী চার মাসের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়।
হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করা হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হাইকোর্ট বিভাগ অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো নির্দেশ দিতে পারেন না, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা মন্ত্রণালয় আইনগতভাবে করতে বাধ্য নয়। বাণিজ্য সংগঠন আইনে সরকারের সুযোগ রয়েছে প্রয়োজনবোধে প্রশাসকের মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত নেওয়ার। তাই হাইকোর্টের দেওয়া সময়সীমার কারণে আমরা সংক্ষুব্ধ হয়েছিলাম।
চেম্বার আদালতের আদেশের ফলে এখন আর কোনো আইনি বাধা রইল না জানিয়ে তিনি বলেন, হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত হওয়ায় প্রশাসক ফজলুল হকের দায়িত্ব পালন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার পথ সুগম হলো। প্রাথমিক ১২০ দিনের যে মেয়াদ ছিল, সরকার চাইলে তা বাড়িয়ে এক বছর পর্যন্ত করতে পারবে। ফলে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের পথ উন্মুক্ত হলো।
রিটকারীকে সশরীরে তলব
রিটকারী আলাউদ্দিন আল মাসুমের ভূমিকা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, এই রিটকারী আগেও বিভিন্ন সময়ে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে একাধিক রিট করেছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পূর্বে সাবেক প্রশাসক অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রহিম খানের নির্বাচনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও তিনি রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আপিল বিভাগ সেই রিটটি হাইকোর্টে চূড়ান্ত শুনানির নির্দেশ দিলেও তিনি শুনানি করেননি। এর আগে ২০২৫ সালে সদস্যদের ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে রিট করে তিনি নির্বাচন স্থগিত করান, যা পরে আপিল বিভাগ স্থগিত করে পথ উন্মুক্ত করে।
অ্যাটর্নি জেনারেল অভিযোগ করেন, আপিল বিভাগের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি আগের রুল শুনানি না করে গত ১৭ আগস্ট নতুন হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে আরেকটি আদেশ নেন। এরপর ২৩ আগস্ট তিনি আগের মামলাটি শুনানি না করে তা ‘নন-প্রসিকিউশন’ (প্রত্যাহার) করে নেন। আপিল বিভাগকে উপেক্ষা করে আদালতকে এভাবে বিভ্রান্ত করার বিষয়টি আজ আমরা চেম্বার বিচারপতির নজরে এনেছি।
আদালত রিটকারীর এ ধরনের আচরণকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে আগামী ১৬ নভেম্বর তাকে সশরীরে আপিল বিভাগে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা।
বিদেশি আইনজীবী নিয়োগে বার কাউন্সিলের অনুমতি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষে শুনানির জন্য বিদেশি আইনজীবীদের অনুমতি সংক্রান্ত আবেদনের বিষয়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনার জন্য বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের অনুমতি প্রয়োজন। ট্রাইব্যুনাল থেকেও এ বিষয়ে আমাদের পদক্ষেপ জানতে চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি ইতোমধ্যে এসব আবেদন পরবর্তী বার কাউন্সিল সভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর বিচার ও আপিল শুনানি বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্য সম্পূর্ণ আলাদা এবং সেখানে একটি স্বতন্ত্র প্রসিকিউশন টিম রয়েছে। এটি সরাসরি অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের জুরিসডিকশন বা দৈনন্দিন পরিধির মধ্যে পড়ে না।
তার ভাষ্য, সংবিধান অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দেশের যেকোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে আমার বক্তব্য উপস্থাপনের সাংবিধানিক অধিকার (রাইট অব অডিয়েন্স) রয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত ও প্রসিকিউশনের বিষয়গুলো তাদের নিজস্ব টিমই পরিচালনা করবে।
বার কাউন্সিলে ‘সমন্বয়হীনতা’র অভিযোগ নাকচ
বার কাউন্সিলের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয়হীনতা নেই বলে দাবি করে
তিনি বলেন, বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান একজন অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও সিনিয়র ব্যক্তি। তিনি আইনজীবীদের পেশাগত মানোন্নয়ন এবং বিভিন্ন পরামর্শমূলক কথা বলেছেন। কোনো একটি বক্তব্যকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখে ভুল বোঝাবুঝি বা সমন্বয়হীনতা খোঁজার সুযোগ নেই। বার কাউন্সিলের বৈঠক একটি নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এবং তা স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে।
আরএনবি/এফএ




