চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই সাক্ষীর জবানবন্দিতে পুলিশ ও বিজিবির চার সদস্যের নাম উঠে এসেছে। সাক্ষীরা দাবি করেছেন, রামপুরার ডিআইটি রোড ও একরামুন্নেছা স্কুলের সামনে পুলিশ, বিজিবি সদস্য এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে তাদের স্বজনেরা নিহত হন।
মামলায় গ্রেফতার বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলম এবং পলাতক ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে এ সাক্ষ্য দেন তারা।
মামলার ১৪ ও ১৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে যথাক্রমে নিহত আমির হোসেনের স্ত্রী আননী (৩০) এবং নিহত মোস্তফা জামান সমুদ্রের বাবা মনিরুজ্জামান তাজল (৬৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
ছেলের হত্যার বিচার চাই
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত মোস্তফা জামান সমুদ্রের বাবা মনিরুজ্জামান তাজল। জবানবন্দিতে তিনি ১৯ জুলাইয়ের সেই ভয়াবহ বিকেলের বর্ণনা দেন।
তিনি জানান, সেদিন শুক্রবার ছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ছেলে সমুদ্রের সঙ্গে জুমার নামাজ পড়তে বের হন তিনি। নিজে মোহাম্মদীয়া মসজিদে এবং ছেলে তাকওয়া মসজিদে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে ফোনে কথা হলে সমুদ্র জানান, তিনি ওয়াবদা রোডে জাহাজ বিল্ডিংয়ের কাছে চা খাচ্ছেন। দ্রুত বাসায় ফিরতে বলার কিছুক্ষণ পর সমুদ্রের মা ফোন দিলে সে জানায়, দুই মিনিটের মধ্যে বাসায় পৌঁছাবে।
কিন্তু এর আট-দশ মিনিট পর ফের ফোন করলে রাফাত নামে সমুদ্রের এক বন্ধু ফোন রিসিভ করে জানান, সমুদ্র রামপুরা ডেল্টা হাসপাতালের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
জবানবন্দিতে মনিরুজ্জামান বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ডেল্টা হাসপাতালে গিয়ে দেখেন, তার ছেলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। গুলি তার বাম বাহুতে লেগে পাঁজর ভেদ করে বুকের ভেতর চলে গেছে।
পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে দ্রুত বেটার লাইফ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক সমুদ্রকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত ছাড়াই একটি ভ্যানে করে ছেলের মরদেহ বাসায় নিয়ে যান তিনি। পরে এলাকার মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের সহায়তায় গোসল ও কাফন শেষে রাতে জানাজা পড়িয়ে গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।
মনিরুজ্জামান জানান, আন্দোলনে যোগ দিতে গিয়েই ডিআইটি রোডে তার ছেলে গুলিবিদ্ধ হন। তিনি বলেন, পরবর্তীতে শুনেছেন রেদোয়ান, রাফাত, রাশেদ ও মশিউর তার ছেলেকে গুলি করেছেন। এদের মধ্যে রেদোয়ান ও রাফাত বিজিবির এবং রাশেদ ও মশিউর পুলিশের সদস্য। তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরাও ছিলেন বলে জানান তিনি।
মাথা ভেদ করে চোয়াল দিয়ে বেরিয়ে যায় গুলি
একই দিন রামপুরার একরামুন্নেছা স্কুলের সামনে গুলিতে নিহত হন আমির হোসেন। ১৪ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তার স্ত্রী আননী (৩০) আদালতে জবানবন্দি দেন।
আননীর স্বামী আমির হোসেন জুমার নামাজের পর আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। দুপুর সোয়া ২টার দিকে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
জবানবন্দিতে আননী বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হাসান নামে একজন ব্যক্তি তাদের পশ্চিম উলনের বাসার মালিককে ফোন করে জানান, তার স্বামী একরামুন্নেছা স্কুলের সামনে গুলি খেয়েছেন। তার বাবা ও ভাই তাকে দেখতে বেটার লাইফ হাসপাতালে যাওয়ার আগেই এলাকার লোকজন তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় বাসায় নিয়ে আসে। জানতে পারেন, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মারা গেছেন।
নিহতের স্ত্রী দাবি করেন, একটি গুলি তার স্বামীর মাথার পেছন দিক দিয়ে প্রবেশ করে চোয়াল দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল। সেদিন গুলিতে একজন রিকশাচালকেরও মৃত্যুর খবর শুনেছিলেন বলে জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আননী তার জবানবন্দিতে তার স্বামীকে পুলিশ ও বিজিবি গুলি করেছে বলে জানান। এ সময় যারা গুলি করেছেন, তাদের মধ্যে বিজিবির রেদোয়ান ও রাফাত এবং পুলিশের মশিউর রহমান ও রাশেদুলের নাম ট্রাইব্যুনালে উল্লেখ করেন তিনি।
এ মামলায় গ্রেফতার হয়ে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেলে আছেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম ও মেজর মো. রাফাত বিন আলম।
পলাতক আসামিরা হলেন ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সময় রামপুরায় ২৮ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালে চারজনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
আরএনবি/এআর




