বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আন্দোলন ঠেকাতে অর্ধশতাধিক যুবককে পঙ্গু করা হয়: ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৮ এএম

শেয়ার করুন:

আন্দোলন ঠেকাতে অর্ধশতাধিক যুবককে পঙ্গু করা হয়: ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য
পুলিশি নির্যাতনে পঙ্গু হওয়া কয়েকজন। ছবি: সংগৃহীত

সরকারবিরোধী আন্দোলন দমাতে যশোরে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের আটক করে নির্যাতন এবং পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করার অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমানের নির্দেশে অর্ধশতাধিক ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ভিন্নমতাবলম্বী যুবকের ওপর এমন নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে দাবি করেছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ চৌগাছায় ২০১৬ সালের একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এ দাবি করেন ঢাকা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখায় (ডিএসবি) কর্মরত উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মমিনুল ইসলাম। তিনি মামলার চতুর্থ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে মমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট ইসরাফিল হোসেন ও রুহুল আমিন নামের দুই যুবককে চৌগাছা থানায় নিয়ে আসেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। তাদের নাম-ঠিকানা হাজতি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাধা দেন। তারা জানান, ওই দুই যুবককে নিয়ে অভিযানে যাওয়া হবে এবং বিষয়টি এসপি ও ওসি জানেন।

মমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি জিডি ও সিসি রেজিস্টার যাচাই করে তাদের নিয়ে কোনো অভিযানে যাওয়ার তথ্য পাননি। বিষয়টি তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানকে জানালে তিনি তাদের নাম রেজিস্টারে না তুলে হাজতে রাখার নির্দেশ দেন। তিনি আপত্তি জানালে ওসি তাকে ‘আমি যা বলি তাই কর’ বলে ধমক দেন বলে জবানবন্দিতে দাবি করেন মমিনুল।

সাক্ষ্য অনুযায়ী, ওই দিন রাত ১১টার দিকে ইসরাফিল ও রুহুল আমিনকে ওসির কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর তাদের বের করে আনা হলে মমিনুল তাদের খুঁড়িয়ে হাঁটতে ও কাঁদতে দেখেন বলে জানান। পরে তাদের আবার হাজতখানায় পাঠানো হয়।

পরদিন ৪ আগস্ট সকালে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ব্যারাকে চলে যান মমিনুল। পরে থানায় এসে তিনি জানতে পারেন, এসপি আনিসুর রহমানের নির্দেশে এসআই আকিকুল ইসলাম ওই দুজনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গেছেন।

সেদিন রাতে থানায় ফিরে মমিনুল কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ওসির সঙ্গে গোপনে কথা বলতে দেখেন বলে জানান। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওসি মশিউর রহমানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে যান।

পরে রাত দেড়টার দিকে এক কনস্টেবল তাকে জানায়, বন্দুলীতলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়েছেন। মমিনুলের জবানবন্দি অনুযায়ী, পরে তিনি জানতে পারেন কোনো পুলিশ সদস্যই আহত হননি এবং ঘটনাটি সাজানো ছিল।

তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, পরবর্তী সময়ে জানতে পারেন আগের দিন ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া ইসরাফিল ও রুহুল আমিনের পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছিল।

জবানবন্দিতে মমিনুল ইসলাম আরও বলেন, ঘটনার পর ৫ আগস্ট এসআই মোখলেছুর রহমান বাদী হয়ে ইসরাফিল ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও পুলিশ অ্যাসল্ট আইনে দুটি মামলা করেন। পরে এসআই জামাল হোসেন মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

9+9+

মমিনুলের দাবি, গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় দুজনের পায়ে পচন ধরে। একপর্যায়ে তাদের প্রত্যেকের একটি করে পা কেটে ফেলতে হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট চৌগাছা উপজেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেন ও সাহিত্য সম্পাদক রুহুল আমিনকে আটক করে পুলিশ। তাদের আদালতে হাজির না করে নির্যাতনের পর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে পায়ে গুলি করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছুর রহমান, এসআই জামাল হোসেন, এসআই আকিকুল ইসলাম, এএসআই মাজেদুল ইসলাম এবং দুই কনস্টেবল জহুরুল ও সাজ্জাদুর রহমানের জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলায় গ্রেফতার তিন আসামি—তৎকালীন এসআই আকিকুল ইসলাম, কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহুরুল হককে এদিন কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্যদিকে তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।

এর আগে গত ২০ এপ্রিল আট আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলাটির বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। গ্রেফতার আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

আরএনবি/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর