ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে ‘ফরমায়েশি’ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ আখ্যা দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীকে তলব করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউশনের এক আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেন।
আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় ওই দুই আইনজীবীকে সশরীরে ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
তলব করা দুই আইনজীবী হলেন মো. হাসানুজ্জামান তুষার ও মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী।
ফেসবুকে যা লিখেছিলেন তাঁরা
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার পরপরই আইনজীবী হাসানুজ্জামান তুষার তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রায়ের একটি সংবাদ শেয়ার করেন।
সেখানে তিনি লেখেন, ‘অবৈধ ক্যাঙ্গারু কোর্টের অবৈধ মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন রায়ের তীব্র নিন্দা জানাই। প্রতিবাদ জানাই এবং ঘৃণা ভরে এই রায় প্রত্যাখ্যান করি। রাজপথে সবকিছুর ফয়সালা হবে।’
তাঁর ওই স্ট্যাটাসের নিচে মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী নামে আরেক আইনজীবী মন্তব্য করেন, ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের অবৈধ রায়ের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এই ফরমায়েশি রায় প্রত্যাখ্যান করছি।’
পরে হাসানুজ্জামান তুষার আরও একটি স্ট্যাটাস দিয়ে একই ধরনের কথা লেখেন এবং তাঁদের কিছু ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করেন।
তবে তলবের খবর প্রকাশ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের একাংশ এই দুই আইনজীবীর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা গেছে।
আইনি মোকাবিলার ঘোষণা
এদিকে নিজের দেওয়া ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিষয়টি স্বীকার করেছেন আইনজীবী হাসানুজ্জামান তুষার। তিনি জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে আইনিভাবেই বিষয়টি মোকাবিলা করবেন।
এটিকে একটি ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন। তবে আদালতের তলবে সাড়া দিয়ে আইনি লড়াই চালানোর কথা জানিয়েছেন তিনি।
প্রসিকিউশন কেন ব্যবস্থা নিল
শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়, রায় নিয়ে আরও অনেক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ এমনকি আইনজীবীরাও ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন।
চিফ প্রসিকিউটরের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রসিকিউশন সাধারণত এসব সমালোচনা উপেক্ষা করে থাকে। কিন্তু এই দুই আইনজীবীর বিষয়টি ধর্তব্যে নেওয়া হয়েছে, কারণ তাঁরা আইন জানেন।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম বলেন, ‘তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। একটা রায়ের বিরুদ্ধে কী বলা যায়, বা আদালতের বিরুদ্ধে কী বলা যায় বা না যায়—এটা ওনারা জানেন। এই ফেসবুক স্ট্যাটাসটি অনেক শেয়ার ও কমেন্ট হয়েছে।’
ব্যবস্থা নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষ যখন দেখবে একজন আইনজীবী একটা আদালত সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য প্রকাশ করছেন, তখন তাদের মনে হতে পারে যে এটি বৈধ। মানুষের কাছে যেন এই বিভ্রান্তি পৌঁছে না যায়, সেজন্যই আমরা ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।’
প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে আরও জানায়, হাসানুজ্জামান তুষার ট্রাইব্যুনালকে ‘অবৈধ ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ এবং রায়কে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলার পাশাপাশি ‘রাজপথে ফয়সালা’ করার কথা বলে হুমকি দিয়েছেন।
আইনে যা আছে
আবেদনে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ১১(৪) ধারার কথা উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।
এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালের কোনো কার্যক্রমে বাধা দিলে, কোনো পক্ষ বা সাক্ষীকে হুমকি দিলে অথবা আদালত অবমাননার শামিল কোনো কাজ করলে বা ট্রাইব্যুনালের রায় অমান্য করলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ দিতে পারবেন।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আবেদনটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করেন এবং অভিযুক্ত দুই আইনজীবীকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আরএনবি/এআর




