জুলাই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, জনপ্রিয় লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ আটজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই অভিযোগ দাখিল করা হয়।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এসব অভিযোগ আনা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রসিকিউটর জিএইচ তামিম বলেন, 'তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিসহ বেশ কিছু লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা এবং পুলিশের হামলার জন্য উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। তারা ষড়যন্ত্র করেন, অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা (অ্যাটেম্পট) ও মদত (অ্যাবেটমেন্ট) দেন। এই অভিযোগে আমরা একটা ফরমাল চার্জ দাখিল করেছি।'
আসামিদের নাম জানতে চাইলে এই প্রসিকিউটর বলেন, 'যেহেতু এখনও ট্রাইব্যুনালে এটার শুনানি হয়নি এবং কিছু আসামি পলাতকও আছেন, তাই আমরা সব আসামির নাম বলতে চাচ্ছি না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর জনাব মাকসুদ কামালসহ মোট আটজনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।'
শিক্ষক ও অন্যান্য আসামিদের ভূমিকার বিষয়ে তামিম আরও বলেন, 'কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো— ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা যখন আন্দোলনকারীদেরকে 'রাজাকারের নাতি-পুতি' বা 'রাজাকারের বাচ্চা' বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন, তারপর তারা এই বক্তব্যটাকে ক্যারি আউট করে (বহন করে) তাদের সাব-অর্ডিনেটদেরকে (অধীনস্থ) দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতন চালান। শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথোপকথন করে ছাত্রদের হত্যা ও নির্যাতন করার ষড়যন্ত্রও করেন তারা।'
এর আগে গত ৬ আগস্ট এই আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল তদন্ত সংস্থা। তদন্ত সংস্থা কাজ শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর প্রসিকিউশন টিম তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র যাচাই-বাছাই (স্ক্রুটিনি) করে।
কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
দাখিল করা অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কে এম জামাল উদ্দিন এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান।
তবে এই মামলায় আসামি হতে পারেন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রসিকিউশন জানিয়েছে, গত ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা এবং হামলাকারীদের পরোক্ষ মদত দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে আন্দোলনকারীদের বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ছিল বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ঢাবি শিক্ষক কে এম জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে।
পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি সশস্ত্র হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে সাবেক মন্ত্রী, আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংঘটিত অপরাধগুলোর জন্য এই প্রথম কোনো তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযোগ জমা পড়ল।
আরএনবি/এআর




