মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

কাদের-নাছিম-আরাফাতসহ ৭ নেতার কার কী অপরাধ, কী শাস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম

শেয়ার করুন:

কাদের-নাছিম-আরাফাতসহ সাত নেতার কার কী অপরাধ, কী শাস্তি

জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির এবং যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে পাঁচ নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির অর্থে আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে সাত আসামির বিরুদ্ধে রায় পড়া শুরু হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজন হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়, এসব সম্পত্তি বিক্রির অর্থ থেকে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ নিহত ও আহত ব্যক্তিদের বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’ বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

জুলাই আন্দোলনের পর থেকে সাত আসামিই পলাতক রয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ইশরাত জাহান উপস্থিত ছিলেন।

কার কী অপরাধ ও শাস্তি—

ওবায়দুল কাদের: ৩টিতে মৃত্যুদণ্ড, ১টিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড

ওবায়দুল কাদেরকে ১, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং ২ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যে অভিযোগ: আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দেন কাদের। ১৫ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে ছাত্রলীগকে ব্যবহারের নির্দেশ, ইন্টারনেট ধীর করা, পুলিশ-র‍্যাবকে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ এবং ১৯ জুলাই ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনার অভিযোগও আনা হয়েছে।

আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম: ১টিতে খালাস, ১টিতে আমৃত্যু, ২টিতে মৃত্যুদণ্ড

বাহাউদ্দিন নাছিমকে ২ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ১ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যে অভিযোগ: অভিযোগ অনুযায়ী, ৯ ও ১৫ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে বসে ছাত্রলীগকে হামলার নির্দেশ ও প্ররোচনা দেন নাছিম। নিজ জেলা মাদারীপুরে আন্দোলন দমনের বিষয়টি তদারকি করেন। তাঁর নির্দেশে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ৪ আগস্ট ফার্মগেটে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং তাঁর প্ররোচনায় ঢাকা-৮ আসনে সশস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মোহাম্মদ আলী আরাফাত: ১টিতে খালাস, ১টিতে আমৃত্যু, ২টিতে মৃত্যুদণ্ড

মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে ৩ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ২ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১ ও ৪ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যে অভিযোগ: ১৩ ও ১৯ জুলাই উসকানিমূলক বক্তব্য, ১৪ জুলাই দিবাগত রাতে বহিরাগতদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার পরিকল্পনা, ১৯ জুলাই মহাখালী ও গুলশানে হামলা চালিয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যা এবং ১৮ ও ২২ জুলাই কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

শেখ ফজলে শামস পরশ: ১টিতে খালাস, ১টিতে আমৃত্যু, ২টিতে মৃত্যুদণ্ড

যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশকে ১ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ২ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে পৃথকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যে অভিযোগ: যুবলীগের চেয়ারম্যান হিসেবে অধীনস্থ নেতাকর্মীদের সশস্ত্র অবস্থায় হামলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পরশের বিরুদ্ধে। তাঁর নির্দেশ ও নেতৃত্বে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা হামলা চালায় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। ১৮ জুলাই সারা দেশে গুলিতে অন্তত ২৩ জন নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ১ আগস্ট আন্দোলনকে ‘আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মাইনুল হোসেন খান নিখিল: ১টিতে আমৃত্যু, ৩টিতে মৃত্যুদণ্ড

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলকে ১ নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ২, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে পৃথকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যে অভিযোগ: ১২ জুলাই সিলেটে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ, ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় অংশ নেওয়া এবং ১৯ জুলাই মিরপুরে অস্ত্র হাতে দলীয় ক্যাডারদের নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর সরাসরি নেতৃত্ব ও নির্দেশে মিরপুরে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে রুস্তম, আসিফ ইকবালসহ ২৬ জনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

সাদ্দাম হোসেন: ২টিতে আমৃত্যু, ২টিতে একত্রে মৃত্যুদণ্ড

ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে পৃথকভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যে অভিযোগ: ১১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ বলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সাদ্দামের বিরুদ্ধে। ওই দিন ওবায়দুল কাদেরের সরাসরি নির্দেশ পেয়ে আন্দোলন দমনে দলীয় পরিকল্পনা করেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাবিতে বহিরাগতদের নিয়ে হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া এবং আহতদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ১৬ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে তাঁর বক্তব্যের পর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলা চালায় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান: ২টিতে আমৃত্যু, ২টিতে একত্রে মৃত্যুদণ্ড

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে পৃথকভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যে অভিযোগ: ১৩ জুলাই মধুর ক্যান্টিনে ‘ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন’-এর নামে আন্দোলনকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় হেলমেট পরা অবস্থায় মাঠে থেকে সরাসরি তদারকি করার অভিযোগ রয়েছে ইনানের বিরুদ্ধে। আল জাজিরায় ফাঁস হওয়া কথোপকথনে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ পেয়ে তা বাস্তবায়নের বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবার বিরুদ্ধে অভিন্ন অভিযোগ

সাত আসামির বিরুদ্ধেই ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিদের নির্দেশ, উসকানি, প্ররোচনা ও সম্পৃক্ততায় মারণাস্ত্র ব্যবহার করে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে গুরুতর জখম করা হয়। অপরাধ সংঘটনের নির্দেশ, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে সাতজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২)(ক), (গ), (হ) এবং ৪(১), (২), (৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

যেভাবে এগিয়েছে বিচারকাজ

২০২৫ সালের ১৮ জুন এ মামলার তদন্ত শুরু হয়। ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এরপর ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ওই দিনই অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি ও রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগসহ বিভিন্ন ধাপ শেষে ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়।

গত ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন। ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষ হলে রায়ের জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ রাখা হয়।

প্রেক্ষাপট ও সপ্তম রায়

জুলাই আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। এটি ট্রাইব্যুনালের সপ্তম রায়।

এর আগে দুটি ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় দিয়েছেন। এসব রায়ে ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১১ জন পলাতক এবং ৪ জন কারাগারে রয়েছেন।

জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর প্রায় ১০ মাস পর মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো।

আরএনবি/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর