মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘মারো’ মানে হত্যা নয়, কাদের-আরাফাতরা ছিলেন ‘পোস্টবক্স’: আইনজীবী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

‘মারো’ মানে হত্যা নয়, কাদের-আরাফাতরা ছিলেন ‘পোস্টবক্স’: আইনজীবী
আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী বি এম হাসান ইমাম। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতরা মূল নির্দেশদাতা ছিলেন না; তারা কেবল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ নিচের দিকে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘পোস্টবক্স’ হিসেবে কাজ করেছেন বলে দাবি করেছেন তাদের পক্ষের আইনজীবী।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা ঘোষণার পর সাংবাদিকদের কাছে এ দাবি করেন আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স কাউন্সিল) বি এম হাসান ইমাম।

এদিন ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পলাতক থাকায় এসব আসামির পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য রাষ্ট্র বি এম হাসান ইমামকে নিয়োগ দিয়েছিল।

রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই আইনজীবী রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারি নাই। একটু কম সাজা দিলেও পারতেন। তবে একজন সাধারণ নাগরিক এবং স্টেট ডিফেন্স লয়ার হিসেবে আমরা সবাই আইনের অধীন, আইন মেনে চলতে এবং মেনে নিতে বাধ্য।’

‘আদেশ আসত শেখ হাসিনার কাছ থেকে’

আদালতে আসামিদের পক্ষে কী যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বি এম হাসান ইমাম বলেন, ‘আমি বলেছিলাম যে, এই সমস্ত আদেশ, কমান্ড বা নির্দেশনাগুলো একজন ব্যক্তির কাছ থেকেই আসছিল (লোন হর্সেস মাউথ), আর তিনি হলেন শেখ হাসিনা। আমার আসামিরা শুধু ‘পোস্টবক্সের’ মতো নিচের দিকে উনার আদেশটা কনভে (হস্তান্তর) করেছে।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি ফোনালাপের অডিওর বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘উনি (কাদের) টেলিফোনে কথা বলেছিলেন, ‘মারো না কেন?’। ‘মারো না কেন’—এটার মানে এই না যে একদম মেরে ফেলা বা কিল (হত্যা) করা। এটা প্রহার বা মারধর করাও (বিট বা বিটিং) হতে পারে।’

‘ঘটনাস্থলে ছিলেন না আসামিরা’

প্রসিকিউশনের আনা ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ (ঊর্ধ্বতন হিসেবে নির্দেশনার দায়) বা সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির অভিযোগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আসামিপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, ‘এই থিওরিটির উদ্ভব হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে, যখন জাপানি জেনারেলদের ম্যানিলা ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়। এর মূল কথা হলো—অধীনস্থ কর্মচারীরা বা সৈনিকরা কোনো অপরাধ করলে কমান্ডার বা সুপিরিয়র অফিসার দায়ী থাকবেন।’

এই আইনি তত্ত্বের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, ‘ফিল্ডে হয়তো অনেক ঘটনা ঘটেছে, হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, উভয়পক্ষের মধ্যে মারামারিও হয়েছে। লোকজন মরেছে, এটা সত্য। পুলিশও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু আমার আসামিরা সরাসরি উপস্থিত থেকে কোনো হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেনি কিংবা কোনো কমান্ডও দেয়নি।’

রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আসামিপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, ‘উনারা কোনো হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন না—এমন প্রমাণই এসেছে। তাহলে হত্যাকাণ্ডের দায়ে উনাদেরকে দায়ী করা যায় না। তাদের অধীনস্থরা অন্যায় করেছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং তারা সেই হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে (রেস্ট্রেইন) পারে নাই—মূলত অধীনস্থদের কারণে এই অপরাধেই আমার আসামিদেরকে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট (মৃত্যুদণ্ড) দেওয়া হয়েছে।’

‘যোগাযোগ থাকলে আরও ভালোভাবে লড়তে পারতাম’

পলাতক আসামিদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না থাকায় আইনি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন বি এম হাসান ইমাম।

তিনি বলেন, ‘আসামিদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো যোগাযোগ নাই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে বা তাদের লোকেরা যোগাযোগ করে কিছু পেপারস ও তথ্য-উপাত্ত দিলে মামলাটা আমরা আরেকটু ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারতাম।’

আদালতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নজির (প্রেসিডেন্ট) ও অনেক যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা হয়েছে জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘মাননীয় ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে থেকেই রায় দিয়েছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পরেই আমরা বুঝতে পারব, আমাদের উপস্থাপিত নজিরগুলো উনারা বিবেচনায় নিয়েছেন কি না। মাননীয় ট্রাইব্যুনালের সমালোচনা করার কোনো এখতিয়ার আমার নেই।’

আরএনবি/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর