মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

কাদের-সাদ্দাম-ইনানদের ভাগ্যে কী আছে, রায় আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

শেয়ার করুন:

কাদের-সাদ্দাম-ইনানদের ভাগ্যে কী আছে, রায় আজ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ (মঙ্গলবার)।

গতকাল সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

মামলাটিতে ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।

গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় হতে যাচ্ছে আজ।

প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে সমন্বিতভাবে নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আহ্বান জানানোসহ একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা করেন। কোথাও কোথাও সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শাস্তিযোগ্য।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন একই আদালত। 

গত ২ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষ্য দেন।

১২ আগস্ট যুক্তিতর্ক শেষে ট্রাইব্যুনালে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজার আর্জি জানান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পেরেছে। গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষকে হত্যা ও আহত করার জন্য তারা দায়ী, তাদের কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।’

শুনানিতে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামিম বলেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়। অডিও-ভিডিওতে এসবের প্রমাণ মিলেছে। ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির (শুট অ্যাট সাইট) নির্দেশ দিয়েছিলেন, যার ফলে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।

‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ বা যৌথ অপরাধের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আন্দোলন দমনে নেমে একজন নিহত হলেও আসামিরা সমান অপরাধী বলে গণ্য হবেন।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা যুক্তিতর্কে তাদের মক্কেলদের নির্দোষ দাবি করে খালাস চান।

ওবায়দুল কাদের, নাছিম ও আরাফাতের পক্ষের আইনজীবী এম হাসান ইমাম দাবি করেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় শুট অ্যাট সাইটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘আমার মক্কেলরা কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না। কমান্ড রেসপন্সিবিলিটিতে একজনকেই আমি দায়ী করি। সব ধরনের নির্দেশই উৎসারিত হয়েছে শুধুমাত্র তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখে। কিন্তু তাকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি।’

এই আইনজীবী আরও বলেন, ২৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জন ভুক্তভোগীর আত্মীয়স্বজন। তাদের কেউই এই তিনজনকে জড়িয়ে কোনো সাক্ষ্য দেননি।

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার (পরশ, নিখিল, সাদ্দাম ও ইনান) পক্ষের আইনজীবী ইশরাত জাহান দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার মক্কেলদের নাম আসেনি; বরং তারা অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র রাজনীতি করার কারণে আন্দোলন ঘিরে কিছু কথা উচ্চারণ করেছেন তারা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রসিকিউশনের কোনো ভিডিওতেই তাদের হাতে লাঠিসোঁটা ছিল না। এছাড়া নারীদের আহত হওয়ার কথা বলা হলেও কোনো নারী সাক্ষী আদালতে আনা হয়নি।’

এ সময় ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশে বিশৃঙ্খলা চলছিল উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ ওই সময় ছিল না।

গত ১৭ আগস্ট যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হলে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-২।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তারপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি মামলার রায় দিয়েছে। এসব রায়ে ৬১ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৫ জনকে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ১১ জনই পলাতক, কারাগারে বন্দী আছেন ৪ জন।

এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর